বর্ণ সাহিত্য পত্রে আপনাকে স্বাগতম। সাহিত্য, শিল্প, সংস্কৃতির কাগজ বর্ণ। আপনার নির্বাচিত লেখা আজই পাঠিয়ে দিন আমাদের ই মেইল এ -Lnrayhan@yahoo.com ।
  • November 11, 2023

শেষ রাতে দেখা একটি সাহসী স্বপ্ন গতকাল আমাকে বলেছে আমি যেন কবিতায় শেখ মুজিবের কথা বলি’ কিংবা ‘মুজিব আমার স্বাধীনতার অমর কাব্যের কবি’ কিংবা ‘কে রোধে তাঁহার বজ্রকণ্ঠ বাণী/গণসূর্যের মঞ্চ কাঁপিয়ে কবি শোনালেন তাঁর অমর-কবিতাখানি/এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম/এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। অথবা ‘যতকাল রবে পদ্মা যমুনা/ গৌরী  মেঘনা বহমান/ততকাল রবে কীর্তি তোমার/ শেখ মুজিবুর রহমান। কত চমৎকারভাবেই না কবিরা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে কাব্যের সোনালি পাতায় স্মরণীয় করে রেখেছেন। এটি ছিলো তাঁর পাওনা। তিনিও কবি ও কবিতা অসম্ভব ভালোবাসতেন বলেই তিনি কাব্যজগতে অমর-অম্লান হয়ে আছেন।

বাল্যকালেই কবিতা তাঁর মন-মগজের সাথে একাকার হয়েছিল। তিনি সুগভীর আগ্রহ নিয়ে কবিতা মুখস্থ করতেন আবার মনের সুখে দরাজ কণ্ঠে আবৃত্তিও করতেন। পরবর্তীতে বক্তৃতার মঞ্চেও তিনি ক্ষেত্র বুঝে কবিতার যথাযথ উদ্ধৃতি দিতেন। এ কাব্যপ্রেমের কারণেই হয় তো তাঁর ভাষণগুলো কাব্যরূপ ধারণ করত। ৭ মার্চের ভাষণ ছিল বাঙালির স্বাধীনতা অর্জনের এক দার্শনিক, বাস্তবিক দিকনির্দেশনা। বঙ্গবন্ধু এ দীর্ঘ অভিযাত্রায় বাঙালির স্বাধীনতার আরেক স্বপ্নদ্রষ্টা কাজী নজরুল ইসলামের ‘বিদ্রোহী’র কাব্যদর্শন দ্বারা গভীরভাবে প্রাণীত হন। ‘বল বীর/বল উন্নত মম শির।/শির নেহারি আমারি নত শির ওই শিখর হিমাদ্রির।...মহা বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত/আমি সেইদিন হব শান্ত/যবে, উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না।’ স্বাধীন দেশে প্রথম নজরুলজয়ন্তী উপলক্ষে নজরুল একাডেমির স্মারকগ্রন্থে বঙ্গবন্ধু  লেখেন, ‘নজরুল বাংলার বিদ্রোহী আত্মা ও বাঙালির স্বাধীন ঐতিহাসিক সত্তার রূপকার।’

১৯৭১ সালের ৫ এপ্রিল বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের ওপর প্রতিবেদন তৈরি করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিখ্যাত ‘নিউজ উইক’ পত্রিকা প্রচ্ছদ জুড়ে বঙ্গবন্ধুর ছবি প্রকাশ করে এবং তাঁকে ‘পয়েট অব পলিটিক্স’ বা ‘রাজনীতির কবি’ বলে স্বীকৃতি দেয়।  তাদের নিবন্ধ ‘দ্যা পয়েট অব পলিটিক্স’ এ লেখা হয় ‘৭ মার্চের ভাষণ কেবল একটি ভাষণ নয়, একটি অনন্য কবিতা।’ ‘জয় বাংলা’ অভিধাটি আক্ষরিক অর্থে কাজী নজরুল ইসলামই প্রথম ব্যবহার করেন  ১৯২৪ সালে প্রকাশিত তাঁর ‘ভাঙ্গার গান’ শীর্ষক কাব্যগ্রন্থের ‘পূর্ণ অভিনন্দন’ কবিতায়। প্রকাশিত হওয়ার তিন মাস যেতে না যেতেই বৃটিশ সরকার গ্রন্থটিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। কবিতাটিতে ছিল বাঙালি জাতির অধিকার আদায়ের ভবিষ্যৎ মুক্তিযুদ্ধের অবশ্যম্ভাবী বিজয়ের ইঙ্গিত। বঙ্গবন্ধু এ কালজয়ী অভিধাকে স্লোগান হিসেবে ব্যবহার করে এর জাদুকরী প্রাণশক্তি দিয়ে বাঙালি জাতিকে উজ্জীবিত করেছিলেন। ‘বাংলাদেশ’ যার কালজয়ী বিজয়।

বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দীক্ষাগুরু হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে করাচি ভ্রমণে গাড়িতে কয়েকজন অ্যাডভোকেট ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর ভাষায়Ñ আমার কাছে তাঁরা নজরুল ইসলামের কবিতা শুনতে চাইলেন। আমি তাঁদের ‘কে বলে তোমায় ডাকাত বন্ধু’, ‘নারী’, ‘সাম্য’ আরো কয়েকটা কবিতার অংশ শুনালাম। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের কবিতাও দু-একটার কয়েক লাইন শুনালাম। শহীদ সাহেব তাঁদের ইংরেজি করে বুঝিয়ে দিলেন।’ একাত্তরের রক্তঝরা মধ্য মার্চে সাংবাদিকদের সাথে এক সাক্ষাৎকারে বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তরে দিতে গিয়ে এক পর্যায়ে তিনি নজরুলের কবিতা তরজমা করে বলেন, I can smile even in hell. বঙ্গবন্ধু রবীন্দ্রনাথের কবিতার উদ্ধৃতি দেন ‘চারিদিকে নাগিনীরা ফেলিতেছে বিষাক্ত নিঃশ্বাস, শান্তির ললিত বাণী শুনাইবে ব্যর্থ পরিহাস।’ অগ্নিঝরা মার্চের আরেক দিনের কথা। টঙ্গিতে পাকহানাদার বাহিনীর গুলিতে অসংখ্য শ্রমিক হতাহত হন। বিক্ষুব্ধ ও প্রতিবাদী শ্রমিকরা স্লোগানে স্লোগানে প্রকম্পিত এক বিশাল মিছিল নিয়ে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে সমবেত হন। বঙ্গবন্ধু তাদের উদ্দেশ্যে বক্তৃতা দিচ্ছিলেন। বক্তৃতার উপসংহারে গিয়ে তিনি উত্তেজিত সংগ্রামী শ্রমিকদের সুউচ্চ ভরাট কণ্ঠে বিদ্রোহী কবির কবিতার উদ্ধৃতি দেন ‘বিদ্রোহী রণক্লান্ত, আমি সেইদিন হবো শান্ত, যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দনরোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না, অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভীম রণ ভূমে রণিবে না।’ জেলখানায় একবার বাবা-মায়ের কথা মনে পড়ে যায়। এ কষ্টকর সময়ে মনকে সান্ত্বনা দেবার জন্য বঙ্গবন্ধু রবীন্দ্রকাব্যে আশ্রয় নেন। ‘মনে মনে কবিগুরুর কথাগুলি স্মরণ করে একটু শান্তি পেলাম’ বলে মন্তব্য করেন। ‘বিপদে মোরে রক্ষা করো, এ নহে মোর প্রার্থনা, বিপদে আমি না যেন করি ভয়’ এমন কবিতা বঙ্গবন্ধু ধারণ করে মনে সাহস জোগাতেন।

বঙ্গবন্ধু তাঁর বৈচিত্র্যময় রাজনৈতিক জীবনেও দুঃখ-দৈন্য-হতাশায়-উপেক্ষায় ‘বিপদে মোরে রক্ষা কর এ নহে মোর প্রার্থনা, বিপদে যেনো না করি আমি ভয়’, অথবা ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে’ প্রভৃতি অসংখ্য কাব্যকথা মনের মাধুরী দিয়ে কণ্ঠে ধারণ করে শান্তি ও সান্ত্বনা খোঁজতেন। কারাজীবনে বঙ্গবন্ধুর সাথী ছিল ‘সঞ্চয়িতা’। কাব্যের প্রতি কতটা ভালোবাসা থাকলে এমনটি হয়। শান্তিনিকেতনের এক সময়ের শিক্ষার্থী ও সাংবাদিক অমিতাভ চৌধুরীকে মুক্তির পরে এক সাক্ষাৎকারে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘সব মিলিয়ে ১১ বছর কাটিয়েছি জেলে। আমার সব সময়ের সঙ্গী ছিল এই সঞ্চয়িতা। কবিতার পর কবিতা পড়তাম আর মুখস্থ করতাম। এখনও ভুলে যাইনি। এই প্রথম মিয়ানওয়ালি জেলের নয় মাস সঞ্চয়িতা সঙ্গে ছিল না। বড় কষ্ট পেয়েছি।’