বর্ণ সাহিত্য পত্রে আপনাকে স্বাগতম। সাহিত্য, শিল্প, সংস্কৃতির কাগজ বর্ণ। আপনার নির্বাচিত লেখা আজই পাঠিয়ে দিন আমাদের ই মেইল এ -Lnrayhan@yahoo.com ।
  • November 11, 2023

অঘ্রান শেষে পৌষের কুয়াশার ভোর। বিলের শান্ত গভীর জলের ওপর অলস অজগরের মতো জমাট কুয়াশার চাদরটা কুণ্ডলী পাকিয়ে বসে আছে এক টুকরো রোদের আশায়। ওদিকে পুব কোণে কপট কুয়াশার আবরণ ভেঙে সূর্য উঁকি দিতে এখনো বেশ কিছুটা সময় বাকি। সেই অপেক্ষায় পুব আকাশের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে ঘোট পাকানো কুয়াশাটা হালকা হচ্ছে ধীরে ধীরে – যেন কোনোই তাড়া নেই। সারারাত আলসেমিতে ডুবে থেকে আড়মোড়া ভেঙে জেগে উঠতেই এখন যত গড়িমসি তার। 

সোনা ঝরা নরম রোদ ও পলাতক ছায়ার এক বিরামহীন কারচুপি বিলের চারপাশ ঘিরে। বড় বড় গাছের ফাঁক দিয়ে স্বচ্ছ আলোর ইশারা আসা-যাওয়া করছে বিলের বুক ছুঁয়ে। কিছুক্ষণ পরই সরল হয়ে নামবে জলের বুকে – যেন অজস্র সোনালি রঙের তীরের ফলা শান্ত সকালের সফেদ এই কুয়াশার চাদরকে ফানা ফানা করে দিতে একযোগে ছড়িয়ে গিয়ে তবেই ক্ষান্ত হবে। সেই অপেক্ষায় চারপাশে বিরাজ করছে এক অপার স্থিতি, সুনসান এক সৌম্য নীরবতা।

বিলের নাম পদ্মাকর। নামটা যেমন সুন্দর ঠিক তেমনি এর বিশালতা। এর ঈষাণ কোণের পাড়টা আধফালি চাঁদের মতো দেখায় বলে লোকমুখে আজ চাঁদবিল নাম হয়েছে তার। শীতে আশপাশের অন্য বিলগুলোতে জল শুকিয়ে গেলেও এই বিলটি তার চেয়ে আলাদা। চাঁদবিলের উত্তর-পশ্চিমে খাড়া উঁচু পাড় – পেছনে বিশাল বুনো বাঁশঝাড়ের আড়ালে চাঁদবিল গ্রাম। জনবসতি ওই গ্রামটি ঘিরেই। গল্পের প্রধান চরিত্র আজাদ মাস্টার ও তার একমাত্র ছেলে টুকু এ-গ্রামেরই সন্তান। গল্পের আবর্তন ও আদ্যোপান্ত তাদের নিয়েই।

কানটুপিতে আগাগোড়া মাথা ঢেকে সারা গায়ে চাদর আর গলাবন্ধ পেঁচিয়ে জবুথবু বেশে খুব সকালে বেরিয়ে পড়ে আজাদ মাস্টার। শীতটা বোধহয় জেঁকেই বসবে এবার। কেবল পৌষের শুরু। গেল বর্ষায় বৃষ্টি হয়নি তেমন। গুরুজনেরা বলতেন, ঊন বর্ষায় দুনো শীত। সেটাই মনে হয় অক্ষরে অক্ষরে ফলতে চলেছে এবার। ফজরের আজানের পর নামাজ সেরে ঘর থেকে বের হন তিনি। ভোরের আলো ঠিকমতো ফুটে ওঠার আগেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়া তার দীর্ঘদিনের অভ্যাস। আজো তার ব্যতিক্রম হয়নি। গাঁয়ের এ-মাথা ও-মাথা অনেকক্ষণ হেঁটে হাঁপ ধরে গেছে তার। চারদিক ফর্সা হয়ে এলে বিলের ধারে প্রকাণ্ড জামগাছটার নিচে এসে দু-দণ্ড জিরিয়ে নেয় আজাদ মাস্টার।

বিলের শান্ত জলে দৃষ্টি প্রসারিত হলে দেখতে পায়, সকালের কুয়াশায় জলকেলিতে মগ্ন কয়েকটা বুনো পাতিহাঁস। জোর করে ঠাহর করলে ছোট সরালি আর মদনটাকের আবছা ছায়াও দেখা যাবে হয়তো। উৎকর্ণ হয়ে তাদের তীক্ষè তবে চাপা আওয়াজ শোনার চেষ্টা করে সে। অনেকদিন পর এক জোড়া রাঙামুড়ি হাঁসের ইতস্তত অনবদ্য বিচরণ তাকে প্রচণ্ডভাবে মুগ্ধ করে। বিলের ধারের জংলা ঢোলকলমির ডালগুলিতে কালো ছায়ামূর্তির মতো অন্ধকার করে বসে আছে বিশাল বিশাল পানকৌড়ি। মোহাবিষ্ট হয়ে সেদিকে তাকিয়ে থাকে সে।

আনমনে ওদিকে দেখতে দেখতেই ডান চোখটা ঝাপসা হয়ে আসে আজাদ মাস্টারের। হঠাৎ টনটন করে উঠে জল গড়াতে থাকে ডান চোখ থেকে। ঝাপসা চোখে চেয়ে থাকে নিথর জলের দিকে আর মনের গোপন অন্দরে শিকারের নেশাটাও জানান দিতে থাকে একটু একটু।

শৌখিন পাখি শিকারি সে। পরিবারের একটা দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যও আছে পাখি শিকারের। কিন্তু ছেলে টুকু পছন্দ করে না বলে তার প্রিয় দোনলা বন্দুকটার গায়ে ধূলির আস্তরণ জমেছে। বেশ অবহেলা ও অযত্নে দেয়ালের গায়ে ঝুলে থাকলেও শোভা বর্ধনের পাশাপাশি পরিবারের গৌরব বৃদ্ধি করছে অসংকোচে। আসলে রেওয়াজ বা ঐতিহ্য ক্ষয়িষ্ণু হলেও ইচ্ছেটার এতটুকু ক্ষয় হয়নি তার। তাই মাঝে মাঝে টুকু বাড়ি না থাকলে কাঁধে বন্দুক চাপিয়ে আশপাশের হাওর-বাঁওড়-বিলে হানা দিয়ে বিলাসী নেশাটা দমনের শুধু চেষ্টা করে আজাদ মাস্টার।

টুকুর বাবা আজাদ তরফদার পেশায় একজন স্কুলমাস্টার। ভুবনডাঙা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক তিনি। পাঁচ গাঁয়ে তার যথেষ্ট সুনাম ও সম্মান। তবে সৌখিন শিকারি আর পূর্বপুরুষের রেখে যাওয়া পুরনো প্রতাপের কারণে পরিচিতি ও নামডাকটা আরেকটু বেশি।

টুকু যখন অনেক ছোট আজাদ মাস্টার তাকে সাইকেলে নিয়ে এ-গ্রাম ও-গ্রাম ঘুরে বেড়াতেন আর শোনাতেন তার ছেলেবেলার গল্প। শিকারের রোমাঞ্চকর সব গল্প। তবে তাদের পরিবারের সবচেয়ে বড় ঐতিহ্য ছিল শিকারি পরিবার হিসেবে। টুকুর দাদারও ছিল নাকি নানান ধরনের বন্দুক। টুকু জানে, বাবার শখ ও নেশাটা উত্তরাধিকারসূত্রেই প্রাপ্ত। তার বাবার শিকার করার যে পুরনো দোনলা বন্দুকটা ছিল সেটা সে তাদের বসার ঘরের দেয়ালে টানানো দেখেছিল অনেকদিন পর্যন্ত। একদিন দেয়াল থেকে বন্দুকটা নামিয়ে হাতে নিয়ে যখন কৌতূহলভরে সে দেখছিল। তখন বাবা তাকে বলেছিল, কী রে, শিকারে যাবি?