বর্ণ সাহিত্য পত্রে আপনাকে স্বাগতম। সাহিত্য, শিল্প, সংস্কৃতির কাগজ বর্ণ। আপনার নির্বাচিত লেখা আজই পাঠিয়ে দিন আমাদের ই মেইল এ -Lnrayhan@yahoo.com ।
  • November 11, 2023

বাজার থেকে বাড়ি ফিরে ললিত শুনল, আবার একটা ঢেউ আসছে।

কণিকার খবর। বাড়ি বসেই খবর পায় কণিকা। ইউটিউব, ইন্টারনেটের ওয়েব পোর্টাল, ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ তার খবরের উৎস। তা ব্যতীত টেলিফোন তো আছেই। বিকেলে খবরের কাগজ খুঁটিয়ে পড়ে কণিকা। ঢেউয়ের পরে ঢেউ আসছে। প্রথম ঢেউয়ে বেসামাল হয়েছে সারাবিশ্ব। তা কমতির দিকে এখন। মানুষজন ভাবছে, মহামারি বিদায় নিচ্ছে। কেউ পরিবার নিয়ে পাহাড়ে ছুটছে, সমুদ্রে ছুটছে। মহামারিতে দম বন্ধ হয়ে আসা মানুষ এসব করে শ্বাস নিতে চাইছে। ললিত কয়েকবার কণিকাকে বলেছে, কোথাও একটা গেলে হয়। টাকিতে ইছামতী নদীর ধারে। কিংবা অযোধ্যা পাহাড়ে, পুরুলিয়ায়। বিষ্ণুপুরের মন্দির দেখে আসে আবার। পাঁচমুড়ায় গিয়ে হাতি-ঘোড়া কিনে আনে। যাবে যাবে ভাবছে ললিত, তাকে ঠেকিয়ে রাখছে কণিকা, আর একটু কমুক। তুমি আমি দুজনে। একজনের যদি কোভিড হয়ে যায় এই বয়সে, তখন কী হবে? ললিতের মনে হয়, কণিকার ভয় অমূলক। কমে গেছে মহামারি। ভাইরাস দুর্বল হয়ে পড়েছে। এরই ভেতর বাড়ি বসে বসে কী খবর পেল কণিকা?

ললিত বলল, ওসব ফালতু কথা, মহামারি চলে যাওয়ার সময় হয়েছে, সুইডেনের এক বিজ্ঞানী বলেছে।

হু বলছে, মহামারি যাবে না। কণিকা বলল, দুর্ভোগ এখনো অনেক, নতুন আরেকটা ভাইরাস দেখা দিয়েছে, জিকা ভাইরাস, ইন্ডিয়ায় আসেনি এখনো, কিন্তু এসে যাবে।

যে যেমন পারে বলে যাচ্ছে, কী হবে কেউ জানে না। ললিত বিড়বিড় করে বলল।

তারা দুজনে কথা বললেই কথা হয়। বাতাসে ঢেউ ওঠে শব্দের। তা বাদে বাড়ি প্রায় নিঝুম। একতলার সব ঘর তালাবন্ধ। একটি খোলা আছে। সেখানে রান্নার মেয়েটি থাকে। এখন সে আর মেয়ে নেই। বুড়ি। এই বাড়িতে এসেছিল যখন বছর বাইশ। বিয়ে হয়েছিল। স্বামী তাড়িয়ে দিয়েছে। বসিরহাটের দিকে বাড়ি। সে আশ্রয় পেয়েছিল ললিতের বাড়িতে। না আশ্রয় নয়, বহাল হয়েছিল। তারপর থেকে রয়েই গেছে। বিয়ের পর একটি সন্তান হয়েছিল অশ্রুর। কয়েক মাস বেঁচে মরে গিয়েছিল। তারপরও মাস তিন সংসার করেছিল। সেসব অনেক গল্প। চেনা কাহিনি। অশ্রু এই বাড়িতে কাজ করতে আসে বাড়ি ছেড়ে। ভাইয়ের সংসারে গলগ্রহ হয়ে

থাকবে কেন? থাকা যেতও না। তারা ঠেলছিল দুর্বৃত্ত স্বামীর ঘরে। অশ্রু ভ্যাকসিন নেয়নি। তার ভয় করে। সুঁই ফোটাতে তার খুবই ভয়। তারপর জ্বর আসবে। ললিত তাকে বুঝিয়েছে খুব। কিন্তু সে অনড়। বাজারঘাট করে ললিতই। আর আছে বাড়ি পরিষ্কার, বাসন মাজার জন্য এক মুসলমান বউ। রুকসানা বিবি। সে-ও এটা-ওটা এনে দেয়। ললিত সবদিনই মাস্ক পরে বেরোয়। বেরোতে তার ভালো লাগে। সকালের রোদ লাগাতেও বেরোয়। হেঁটে আসে। দেখছে, সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে যাচ্ছে, একটা লোক, ললিত তাকে মুখে চেনে কিন্তু নাম জানে না, ললিতকে বাজারেই বলল, কলেজ স্ট্রিট খুলেছে, সে তার দোকান খুলছে, নতুন বই প্রকাশ করবে আবার, ক-মাস খুব কষ্টে কেটেছে, অনলাইন বেচাকেনা ছিল ভরসা। ললিত বলল, কী হবে, কী হবে না, কিছুই বলা যাবে না, চলো ঘুরে আসি পুরুলিয়া থেকে।

মাথা নাড়ে কণিকা, বলল, যদি না আসে ঢেউ, খোকন চলে আসতে পারে।

ললিত চুপ করে থাকে। কণিকার না বেরোনোর কারণ তার পুত্র। সে এসে যেতে পারে। বোঝালেও বুঝবে না। সে তো  পাশের পাড়া থেকে আসবে না। আসবে অন্য মহাদেশ থেকে।

কণিকা বলল, মহামারির সেকেন্ড ওয়েভ আসছে, এখন কেউ বেরোয়?

তাহলে খোকনই বা আসবে কী করে?

সে তো ঢেউ যদি না আসে, ঢেউ না এলে তো আসতেই পারে। কণিকা চুপ করে যায় কথাটা বলতে বলতে। মহামারির পরের ঢেউয়ের খবর সে-ই দিলো; কিন্তু তার বিশ্বাস করতে ইচ্ছেই হচ্ছে না যে, আবার একটা ঢেউ আসছে। সেই ঢেউ আবার সব বন্ধ করে দেবে। তাদের পুত্র খোকন – অভিষেক আছে নিউইয়র্কে। গত জুলাইয়ে আসার কথা ছিল। আসেনি। আসতে পারেনি। তখন নিউইয়র্ক এক বিপজ্জনক শহর হয়ে গিয়েছিল। তার আগের জুলাই যখন, তখনো আসেনি। সেই সময় ক্যালিফোর্নিয়া থেকে নিউইয়র্ক এলো। কয়েকদিন আগে হোয়াটসঅ্যাপ কলে বলেছে, কোভিড কমলে আসবে; কিন্তু তারা সুইডেন গিয়েছিল সকলে মিলে। সে অবশ্য করোনা আসার আগে। আবার একটা ঢেউ আসা মানে ২০২২-২৩-এর আগে কি আসতে পারবে? মা-বাবা, এদেশের ওপর থেকে মায়া চলে গেছে মনে হয়। তার নিজের পরিবার, সন্তান হয়েছে। দীর্ঘশ্বাস নেয় ললিত। কণিকা মুক্ত হতে পারছে না। মানুষের এখন পাখির মতো হওয়া দরকার। সন্তান উড়ে গেছে পশ্চিমে। ওদেশে জিসি পেয়ে গেছে। কণিকা শুধুই ডাক দেয়, খোকন কবে ফিরবি? তাদের যাওয়ার কথা ছিল। তখন মহামারি এসে গেল।

ললিত খুব কষ্ট করে করেছিল বাড়িটি। তিন কাঠা জমি পেয়েছিল শহরতলির উত্তরাঞ্চলে এই জায়গায়। মিউনিসিপ্যালিটি কাছে, বাজার কাছে, হুগলী নদী-গঙ্গা কাছে। তখন এই পতিত জমি প্লটিং করে বিক্রি হচ্ছিল। গোটা পঞ্চাশ প্লট নিয়ে সারদা কলোনি। ললিতের মনে তখন একান্নবর্তী পরিবার গড়ার এক বাসনা জেগেছিল। তাই ঋণ নিয়ে দোতলা। দুই ভাই একতলায় থাকবে যখন আসবে। এক ভাই থাকে দিল্লি। অন্যজন বাঁকুড়া। তারাও বাড়ি করেছে, ফ্ল্যাট কিনেছে। ললিত আর কণিকা একবার বাঁকুড়া গিয়েছিল। সেখান থেকে বিষ্ণুপুর, মুকুটমণিপুর। দিল্লি গিয়ে বঙ্গভবনে উঠেছিল। সেখান থেকে নয়ডায় গিয়েছিল ভাইয়ের ফ্ল্যাটে। অনেকটা দূর। আর ফ্ল্যাট বেশি বড়ও নয়। বাক্সের মতো। নড়াচড়া কষ্টের।

 উত্তর শহরতলির এক পুরনো পাড়ায় আধো অন্ধকার ফ্ল্যাটে ললিতের ছোটবেলা কেটেছে। তার বাবার জীবন কেটেছে। তাঁকে ললিত এই বাড়ি দেখাতে পেরেছিল। সে ললিত রায়। পূর্ববঙ্গে তাদের তেমন কিছু ছিল না যে তার জন্য বিলাপ করবে। তবুও একটা দুঃখ ছিল। নিজেদের গ্রাম, নিজেদের নদী, নিজেদের ভিটে ছিল তো। এই দেশে তা নেই। না থাকুক, সকলের কি থাকে? কলকাতা শহরে যত মানুষ থাকে সকলের কি নিজস্ব বাসস্থান আছে? নিজের বাড়ি বা নিজের ফ্ল্যাট? ললিতের সেই বাড়ি এখন নিঝুম, যা ছিল একসময় মানুষের কলরোলে ভরা। ললিত রায় এখন সত্তর হয়নি। কিন্তু হয়ে যাবে কয়েক বছরের ভেতর। ললিতের মনে হয়, গৃহবন্দি থাকতে থাকতে তার সত্তর কেন আশিও হয়ে গেছে যেন। কতদিন এমন যাবে কে জানে?

ললিতকে আমরা চিনে নিতে পারি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের মতো করে। সেই যে তিনি ভালো থেকো, ময়ূরাক্ষী, পুনশ্চ, রবিবার ইত্যাদি সিনেমায় বৃদ্ধের চরিত্র করেছিলেন, তেমনি। আমার আপনাদের ভেতর যারা অমল বিমল কমল এবং ইন্দ্রজিৎ, মানে অতি সাধারণ, কমন ম্যান, তাঁদের ভেতরে যারা ল্যাপটপ ইন্টারনেট ইত্যাদি বোঝেন তাঁরা সন্ধেবেলায় ইউটিউবে কিংবা নানা অ্যাপে সিনেমা দেখতে দেখতে কখনো নিমীলিত চোখে ঢুলতে ঢুলতে এক ছবি থেকে আরেক ছবিতে চলে যান ছবির গল্প ভালো না লাগায়, তিনি ললিত হতে পারেন। এই ললিত বা এই কণিকা। করোনার সময় সিনেমা দেখার অভ্যাস হয়েছে ললিতের। আবার সিনেমা ভালো না লাগলে কণিকার পাশে বসে বাংলা টিভি ধারাবাহিক দেখে। কিছুটা দেখে ললিত ল্যাপটপ কিংবা মোবাইল ফোনে ফেসবুক খুলে নানা রকম লেখা পড়তে পড়তে সাবধানে লাইক মারতে মারতে কিছু সময় ব্যয় করে ফেলে। সময় নিয়েই হলো সমস্যা। ললিতের কাছে অঢেল সময়। ব্যয় করবে কী ভাবে? সাদা পায়জামা, সবুজ কিংবা মেরুন পাঞ্জাবি পরা ললিত উচ্চতায় ছ-ফুট, কেননা ময়ূরাক্ষী সিনেমার সেই বৃদ্ধটি যার স্মৃতি ক্রমশ বিলুপ্ত হচ্ছে, সে-ই যেন ললিত। ললিতের মনে হয়, সে-ই সে। করোনার সময় খুব সাবধানে থেকেছে ললিত। একা মানুষ, মানে একা পরিবার, ললিত ও কণিকা। আর অশ্রু, নিচের তলার অশ্রু, ডাকলে উঠে আসে। না ডাকলে নিচেই থাকে। রান্না শেষ করে গড়িয়ে নেয়। তার জন্য একটি টেলিভিশন আছে। সেও দেখে নিচে বসে। সন্ধে থেকে এই বাড়িতে শুধু টিভি সিরিয়ালের মানুষ কথা বলে। ললিতের এক-এক সময় মনে হয়, বাড়ি আবার কোলাহলে পূর্ণ হয়ে গেছে। যারা আসত এই বাড়িতে, ললিতের নতুন বাড়িতে তারা আবার আসছে। সেই যে বনগাঁর ছোট মাসি এলেন তাঁর ছেলেকে নিয়ে। সেই যে ছোট ভাই এলো বাঁকুড়া থেকে। তার শ্বশুরবাড়িও বাঁকুড়া। এক-এক সময় ঝিমুনির ভেতর ললিত বা কণিকা চমকে ওঠে, আরেকটি সন্তান নিয়ে ললিতের পুত্র হাজির মার্কিন দেশ থেকে। দ্বিতীয় পৌত্রীকে ললিত বা কণিকা দেখেনি, তার জন্ম ২০১৯-এর ডিসেম্বরে।

কণিকা বলল, সেকেন্ড স্ট্রেন, নিউজপেপারে দিয়েছে। আবার লকডাউন, বেরোনো হবে না তোমার।