বর্ণ সাহিত্য পত্রে আপনাকে স্বাগতম। সাহিত্য, শিল্প, সংস্কৃতির কাগজ বর্ণ। আপনার নির্বাচিত লেখা আজই পাঠিয়ে দিন আমাদের ই মেইল এ -Lnrayhan@yahoo.com ।
  • November 11, 2023

প্রিয় পাঠক, আপনার কান দু’টিকে সম্মোহিত করার জন্য এখানে রয়েছে একেবারে মিলিশিয়ান কায়দায় ভিন্ন ভিন্ন গল্পের সমাহার; গল্পগুলি শুনে আপনি মজা পাবেন। অবশ্য আশা করছি, এই নীল নদে পাওয়া খাগড়ার তৈরি কলমের তীক্ষ্ণ ডগা দিয়ে ছাপানো, মিশর থেকে আগত বইটাকে উপেক্ষা করার মতো উন্নাসিকতা আপনার নাই। সেই সাথে এও ধরে নিচ্ছি, মিশরীয় গল্প বলার যে পদ্ধতি, মানে যেসব গল্পে মানুষের দেহের গড়ন ও ভাগ্যের ধরন পালটে গিয়ে বহুরূপ নেয়, আর বিভিন্ন অভিযানের পর সেগুলি আবারও তাদের স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে—সেই প্রকারের গল্প শুনে মনোরঞ্জিত হওয়ার ব্যাপারেও আপনার ইতস্তততা নাই। শুরু করি তাহলে।

কিন্তু তার আগে—আমি কে? সংক্ষেপে বলি: অ্যাথেন্সের নিকটবর্তী হাইমেটাস পর্বত, করিন্থের একসময়কার প্রদেশ এফিরা এবং লাকোনিয়া’র শহর টিনেরাস—এসব স্থানে আমার পিতৃপুরুষদের আদি নিবাস ছিল; যেসব উর্বর স্থান বহু আগে থেকেই আরো উর্বর সব রচনায় অমর হয়ে আছে। শিশুকালে অ্যাথেন্সে আসার পর ওখানেই শিক্ষানবিশ হিসাবে অ্যাথেন্সের ভাষা রপ্ত করি আমি। পরবর্তীতে যখন নিতান্তই একজন ভিনদেশি হিসাবে রোমে যাই, কোনো শিক্ষকের দিকনির্দেশনা ছাড়াই প্রচণ্ড কষ্ট সহ্য করে রীতিমত হামলা চালিয়ে লাতিন ভাষার ওপর দক্ষতা আনতে হয় আমার। কাজেই রোমান মহলের ভাষারীতির একজন আনাড়ি বক্তা হিসাবে আমার যেকোনো ধরনের স্খলন ও কারো মনে কষ্ট দেওয়ার জন্য আমি আগে থেকেই এই অজুহাতে ক্ষমাপ্রার্থনা করে রাখলাম। অবশ্য ভাষার এই যে পরিবর্তন, তা আমার এখানকার লেখার ধরনের সাথে বেশ সঙ্গতিপূর্ণ—সার্কাসের ঘোড়সওয়ার যেভাবে একেক লাফে ঘোড়া পরিবর্তন করে, আমার এ সাহিত্যের ভঙ্গি অনেকটা ওইরকম।

শুরু হতে যাওয়া এই গল্প আসলে একটা গ্রিক উপাখ্যান। যদি গল্পটাতে আপনারা মনোযোগ দেন, প্রিয় পাঠক, তাহলে নিশ্চিত উপভোগ করতে পারবেন।

ব্যবসার কাজে একবার থেসালি যেতে হয়েছিল আমাকে। আমার মায়ের পরিবারের পত্তন ওখানেই। মায়ের দিক থেকে বিখ্যাত প্লুটার্কের বংশধর হবার সৌভাগ্য হয়েছে আমার। এক সকালে উঁচু পাহাড়ের সারি পার হয়ে, পিচ্ছিল পথ ধরে নিচে নেমে সামনে একটা উপত্যকার মাঝখান দিয়ে শিশিরভেজা মাঠ আর সজল চাষের জমি পেরিয়ে এসেছি যখন, আমার খাঁটি থেসালিয়ান বংশজাতের ঘোড়াটা তখন হাঁপাতে হাঁপাতে গতি কমিয়ে দিল। এতক্ষণ ধরে জিনের চাপে বসে থাকতে থাকতে আমিও ক্লান্ত, তাই লাফ দিয়ে নিচে নেমে গেলাম আমি। এক হাতে কয়েকটা পাতা নিয়ে আস্তে করে বেচারার ঘামে ভেজা কপালটা মুছে দিলাম। তারপর ওর কান দু’টায় হাত বুলিয়ে, কাঁধের ওপর লাগামটা তুলে দিয়ে ধীরে ধীরে হাঁটতে থাকলাম ওর সাথে। দম নেওয়ার জন্য একটু সময় দেই ব্যাটাকে, একটু আরাম করুক।

মাঠের মাঝখান দিয়ে চলে যাওয়া আঁকাবাঁকা রাস্তাটার একবার এই পাশ থেকে আর একবার ওই পাশ থেকে মুখভর্তি ঘাস খাবলে নিয়ে প্রাতরাশ সেরে নিচ্ছিল ও, এমন সময় দেখি আমাদের থেকে একটু সামনে দুইজন লোক ক্লান্ত পায়ে হেঁটে যাচ্ছে। গভীর আলাপে মগ্ন। আমি একটু তাড়াতাড়ি হাঁটা ধরলাম, ওরা কী নিয়ে কথা বলছে জানার খুব ইচ্ছা করছিল। যখন একদম পাশপাশি চলে এসেছি তখন ওদের একজন উঁচু গলায় হেসে দিয়ে তার পাশের জনকে বলল: “চুপ করো রে ভাই। বাদ দাও! আমি আর তোমার এইসব উৎকট মিথ্যা কথা নিতে পারছি না!”

একটু আশার আলো পেলাম আমি। গল্পকথককে বললাম, “মাফ করবেন, আপনাদের ব্যাপারে নাক গলানোর জন্য আসি নাই, ভাই। কিন্তু নতুন নতুন জিনিস জানতে পারলে, শিখতে পারলে আমি খুবই আনন্দ পাই। খুব কম জিনিসই আছে যেগুলিতে আমার কৌতূহল নাই। আপনি যদি আপনার গল্পের শুরুতে গিয়ে আবার প্রথম থেকে আমাকে গোটা কাহিনিটা বলতেন, উপকার হত খুব। মনে হচ্ছে আপনার গল্পটা শুনতে পারলে সামনের খাড়া পাহাড়টা আরামে পার হতে পারব।”

যে লোকটা হাসছিল সে বলেই চলেছে: “এইসব আজগুবি আলাপ আর কোরো না আমার সাথে, বুঝেছো? এর চেয়ে বলো জাদু দিয়ে নদীর স্রোত উল্টা দিকে পাঠায় দেওয়া যায়, সাগরকে বরফ বানিয়ে ফেলা যায়, বাতাসকে অচল করে দেওয়া যায়। অথবা এও বলতে পারো যে সূর্যকে মাঝপথে বন্ধ করে দেওয়া যাবে, চাঁদকে বললে শিশিরে বিষ মিশিয়ে দেওয়া যাবে, বা তারাগুলিকে ওদের বলয় থেকে জাদু দিয়ে বের করে ফেলা যাবে। আরে, দরকার হলে এইটাও বলো যে জাদু দিয়ে দিনকে বাতিল করে দিয়ে চিরস্থায়ী রাতের বন্দোবস্ত করে ফেলা যাবে।”

তাও আমি হাল ছাড়লাম না: “না ভাই, আপনি এগুলি কথা মনে নিয়েন না তো। আপনার গল্প আপনি শেষ করেন দয়া করে। মানে খুব বেশি কষ্ট না হলে গল্পটা শেষ করেন৷” তারপর তার পাশের লোকটার দিকে তাকিয়ে বললাম, “আর ভাই আপনি, আপনি যে আপনার বন্ধুর কথার সত্যতা ধরতে পারছেন না—হতে পারে আপনার এমনিতেই বুদ্ধি কম বলে পারছেন না অথবা আপনার জেদের কারণে হচ্ছে না। আপনি কি নিশ্চিত তাকে অবিশ্বাস করার পিছনে এরকম কোনো কারণ নাই? যে জিনিস খুব একটা দেখা যায় না বা যখন বুদ্ধিহীন লোকজন কোনো জিনিস সাথে সাথে বুঝে উঠতে পারে না—তখনই নির্বোধের দল সেটাকে মিথ্যা কথা বলে বাতিল করে দেয়৷ কিন্তু ওসব জিনিস নিয়ে ভাল মতো অনুসন্ধান চালানো হলে দেখা যাবে, ওগুলি যে কেবল অনায়াসে প্রমাণ করা যায় তা-ই না, খুব সহজেই ওরকম জিনিসপাতি আমাদের আশপাশে ঘটে।

যেমন ধরেন, কালকে রাতে খাওয়ার সময় কয়েকজন লোকের সাথে বাজি ধরেছিলাম। বাজিতে জেতার জন্য পনিরের বিরাট এক পিঠা মুখভর্তি করে ঢুকিয়ে দিয়েছি৷ পিঠাটা এমন নরম আর আঠালো ছিল, গলার মাঝখানে গিয়ে ওই জিনিস আটকে গেল। আমার তো পুরা শ্বাসনালী বন্ধ হয়ে গেছে, আরেকটু হলে দম আটকে মরেই যেতাম আমি।

অথচ মাত্র কয়েকটা দিন আগেই, এথেন্সের স্টোয়া পইকিলে’তে দেখে এসেছিলাম—অশ্বারোহী সেনাদের বাঁকা তলোয়ারগুলি আছে না? এক ভোজবাজিকর ওইরকম একটা ধারালো তলোয়ার পুরা গিলে ফেলল৷ তাও আবার সূঁচালো দিকটা আগে ঢুকিয়েছে। আমরা যারা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ওর কীর্তি দেখছিলাম, তাদের কাছ থেকে কিছু পয়সা নিয়ে ব্যাটা আবার একই তরিকায় একটা বর্শা গিলে ফেলল। দেখি, ওই লোক মাথাটা পিছনের দিকে বাঁকা করে ঝুলিয়ে দিয়ে আছে, আর তলোয়ারের হাতলটা বের হয়ে আছে ওর মুখ থেকে। তারপরে বিশ্বাস করবেন না, মেয়েদের মতো সুন্দর দেখতে এক বাচ্চা ছেলে ওই হাতল ধরে শরীর মুচড়ে এমনভাবে নাচা শুরু করল যেন মনে হয় শরীরে একটা হাড়ও নাই। দেখলে মনে হবে চিকিৎসাশাস্ত্রের দেবতা এস্কুলাপিয়াসের এবড়োখেবড়ো সেই লাঠি, আর ওই লাঠির গায়ে তার রাজসাপ পেঁচিয়ে আছে।”

তারপর আমি আবার পাশের লোকটার দিকে ঘুরে তাকালাম: “ভাই, বলেন তো, আপনার গল্পটা বলেন। আপনার বন্ধু বিশ্বাস না করলেও আমি আপনার গল্প বিশ্বাস করব। তার ওপর ধন্যবাদ হিসাবে এরপর প্রথমেই যে সরাইখানা পড়বে সেখানে আপনাকে খাওয়াব ভাই।”

“আপনার প্রস্তাবের জন্য অনেক ধন্যবাদ,” বলল সে, “কিন্তু আমার নিজের অভিজ্ঞতার কথা আপনাকে শোনানোর জন্য আমাকে প্রতিদানে কিছু দেওয়া লাগবে না। যে সূর্য আমাদের সবকিছু দেখে, সেই সূর্যের কসম, আমার গল্পের প্রত্যেকটা বাক্য সত্য। আর আজকে বিকালে যখন আমরা থেসালির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শহর হাইপাতায় গিয়ে পৌঁছাব, সেখানে গেলেই আপনার মনে আমার কথার সত্যতা নিয়ে কোনো সন্দেহ থাকবে না। কারণ ওখানকার সবাই জানে আমার সাথে কী হয়েছে। একদমই গোপন ঘটনা না, বুঝেছেন? শুরুতেই আমার সম্বন্ধে কিছু তথ্য দিয়ে নেওয়া ভাল—আমার নাম কী, আমি কী করি ইত্যাদি। আমার বাড়ি ইজিয়ামে, মুদির ব্যবসা করি। সেই কাজে নিয়মিতই থেসালি, ইটোলিয়া, বিওশিয়া দিয়ে যাতায়াত করা লাগে; মাখন, পনির আর ওইধরনের অন্যান্য মালামাল বেচাকেনার জন্য৷ আমার নাম আরিস্তোমেনেস। যাই হোক, একবার হাইপাতা থেকে খবর আসল যে ওখানে নাকি মোটামুটি কম দামে নতুন এক ধরনের চমৎকার পনির মজুদ করা হয়েছে। আমি সাথে সাথে রওনা হলাম৷ কিন্তু কী আর বলব, আমাদের ব্যবসায় যেমনটা প্রায়ই দেখা যায়, কপাল অনেক খারাপ গেল সেইবার। পৌঁছেই শুনি, লুপাস নামের এক বড় পাইকারি ব্যবসায়ী আগের দিন সব কিনে ফেলেছে।

অযথাই এত দূর থেকে দৌড়িয়ে গিয়েছিলাম, তাই প্রচণ্ড হতাশ হয়ে ওইদিন সন্ধ্যায় আগে আগে হাম্মামখানায় গেলাম গোসল করতে। ওখানে গিয়ে আমার পুরানো বন্ধু সক্রেটিসের সাথে দেখা! কী অবাক কাণ্ড। ওকে দেখে আমি চিনতেই পারি নাই, এত বাজে অবস্থা। শুকিয়ে গেছে, চোখমুখ ফ্যাকাসে। রাস্তার ফকিরের মতো পুরাতন একখান ছেঁড়াফাটা কাপড় পরে মাটির ওপর বসে আছে। একসময় খুব ভাল বন্ধু ছিলাম আমরা, অনেক অন্তরঙ্গতা ছিল। কিন্তু ওইদিন ওর সাথে কথা বলার আগে কেমন ইতস্তত বোধ করছিলাম আমি।

শেষ পর্যন্ত বললাম, “আরে, সক্রেটিস! তোমার এই ভয়ঙ্কর অবস্থা কেন ভাই? এইখানে এভাবে বসে আছ কেন? এসবের মানে কী ভাই? কোনো সন্ত্রাসী কাজকর্ম করেছ নাকি? তোমাকে যে খাতাকলমে মৃত ঘোষণা করা হয়ে গেছে, জানো? তোমার পরিবার তোমাকে নিয়ে আহাজারিও করে ফেলেছে, তোমার শেষকৃত্যের কাজও সব শেষ। তোমার বাচ্চাকাচ্চারা এখন এলাকার আদালতের হেফাজতে আছে। আর তোমার বউ তো কান্নাকাটি করে নিজের চেহারা-ছবি একদম ধ্বংস করে ফেলল, কাঁদতে কাঁদতে প্রায় অন্ধই হয়ে গেছে মনে হয় বেচারি। ওর বাপ-মা তাকে আবারও বিয়ের জন্য তাগাদা দিচ্ছে। আর এদিকে তুমি হুট করে ভূতের মতো হাজির! তুমি তো আমাদের সবাইকে লজ্জায় ফেলে দিলে।”

“আহারে আরিস্তোমেনেস,” জবাবে বলল সক্রেটিস, “ভাগ্যদেবী যে একজন লোকের সাথে কত ধরনের ছলচাতুরী করতে পারে—সে তুমি জানলে এরকম কথা জীবনেও বলতে পারতে না।” বলতে বলতে গায়ের জীর্ণ কাপড়টা নিয়ে লজ্জায় লাল হয়ে যাওয়া মুখটা ঢাকল সে৷ কাপড় ওপরের দিকে টান দেওয়ায় নাভির নিচ থেকে শরীরের বাকি অংশ বের হয়ে গেল ওর। আমি আর এত করুণ দৃশ্য নিতে পারলাম না। ওকে হাত দিয়ে ধরে দাঁড়া করানোর চেষ্টা করলাম, কিন্তু ও কিছুতেই নড়বে না। গোঙানোর মতো করে বলল, “ছেড়ে দাও ভাই! আমাকে ছেড়ে দাও! দেখি ভাগ্যদেবী আর কত খেলা খেলতে চায়! আমার সাথে জেতার জন্য এরকম করছে তো? মনমতো জিততে দাও ওকে!”

শেষ পর্যন্ত আমার সাথে আসতে রাজি হলো সে। আমি যে দুইটা কাপড় পরেছিলাম, সেখান থেকে একটা নিয়ে ওর গায়ে দিয়ে দিলাম আমি৷ তারপর তাড়াতাড়ি একটা খাস গোসলখানায় নিয়ে গেলাম ওকে। ভাল করে গা ঘষে-ডলে কয় আস্তর ময়লা যে পরিষ্কার করলাম! শেষ পর্যন্ত নিজেও ক্লান্ত হয়ে গেছিলাম। তাও কোনোরকমে টেনেহিঁচড়ে আমার সরাইখানায় নিয়ে আসলাম ওকে। একটা মাদুড়ের ওপর শুইয়ে দিয়ে বেশি করে খাবারদাবারের বন্দোবস্ত করলাম ওর জন্য। মদও খাওয়ালাম অনেক। ওর বাড়ির যত খবরাখবর আছে সব জানালাম।

অনেকটা সময় চলে যাওয়ার পর সে বেশ প্রফুল্ল হয়ে উঠল। একসাথে হাসিতামাশা করলাম আমরা, জোরে কথাবার্তা বলা শুরু করলাম। তারপর হঠাৎ আবেগঘন এক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে কপাল চাপড়ে আর্তনাদ করে উঠল সে: “কী দুর্বিষহ জীবন আমার! একটু শখ করে লারিসায় গ্ল্যাডিয়েটরদের সেই বহুল প্রচারিত লড়াই দেখতে চেয়েছিলাম বলেই আজ এ অবস্থা। ওখান থেকেই শুরু।

তুমি হয়ত জানো, আমি ব্যবসার কাজে ম্যাসেডোনিয়ায় গিয়েছিলাম। প্রায় দশ মাস পর সেখান থেকে অনেক মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে বাড়ি ফেরত যাবার জন্য রওনা দিয়েছি, ভাবলাম লারিসায় খেলাটা একটু দেখে যাই। পথিমধ্যে লারিসার একটু আগেই এক জনশূন্য উপত্যকায় ডাকাতরা আমার ওপর হামলা করল। জীবনটা বাদে বাকি সব কিছুই ছিনিয়ে নিল ওরা। বহু কষ্টে ওদের হাত থেকে ছাড়া পেয়ে মরিয়া হয়ে শেষ পর্যন্ত এই শহরে এসে পৌঁছেছি।

এখানে এসে এক সরাইখানায় উঠলাম। সরাইখানাটা মেরো নামের এক মহিলা চালায়। যদিও বয়সের কথা ভাবলে তাকে তরুণী বলা যাবে না, তারপরও দেখতে প্রচণ্ড আকর্ষণীয় সে৷ ওকে যখন নিজের দুঃখের কাহিনি শোনালাম, এত লম্বা সময় পর বাড়ি যাওয়ার জন্য কতটা উদ্বিগ্ন হয়ে আছি এসব বললাম—ও বেশ সহানুভূতি দেখাল। অনেক আয়োজন করে রাতের খাবার খাওয়াল, একটা পয়সাও নিল না। এরপর তার সাথে শোয়ার জন্য বেশ জোর করল আমাকে। কিন্তু যখনই তার খাটে উঠেছি, তখন থেকেই আমার ভেতরটা কেমন অসুস্থ হয়ে যাওয়া শুরু করল। নিজের ইচ্ছাশক্তি কাজ করা বন্ধ করে দিল একদম। যতদিন কাজ করার মতো সুস্থ ছিলাম, ততদিন কুলির কাজ করে দুই পয়সা যা কামাই করেছি তার সবই দিতে হয়েছে তাকে। পরে যখন আরও দুর্বল হওয়া শুরু করলাম, ডাকাতরা দয়া করে যতটুকু কাপড় আমাকে পরে থাকতে দিয়েছিল সেটাও তাকে দিয়ে দিয়েছি। আর এখন তো দেখতেই পাচ্ছ, দুর্ভাগ্য ও মায়াবী নারী আমাকে কোথায় এনে দিয়েছে।”

“হায় খোদা,” বললাম আমি, “নিজের বাড়ি, নিজের বাচ্চাকাচ্চাকে ফেলে এসে এরকম এক বুড়ি ধামড়ি মাগীর সাথে লাম্পট্য করার শাস্তি হিসাবে একদম উচিতই হয়েছে। আরো বেশি শিক্ষা হওয়া দরকার ছিল তোমার।”

“আস্তে আস্তে! চুপ!” ঠোঁটে আঙুল দিয়ে আর্তচিৎকার করে উঠল সে। আশেপাশে ভাল করে দেখল, আমাদের কথা কেউ শুনে ফেলল কিনা, “এরকম অতিমানবীয় নারীকে নিয়ে এসব কথা বোলো না, সাবধান! জবান খুলে পড়ে যাবে।”

“তাই নাকি? তোমার কথা শুনে ওই মহিলাকে তো সাধারণ সরাইখানার কর্ত্রী বলে মনে হচ্ছে না। এমন ভাব করছ যেন আধ্যাত্মিক ক্ষমতাওয়ালা কোনো মহারানি।”

“শোনো ভাই আরিস্তোমেনেস,” বিষণ্ন ভাবে বলতে থাকল সে, “আমার মেরো চাইলে আসমানকে হ্যাঁচকা টানে নামিয়ে জমিনকে উপড়ে ফেলতে পারে। নদীর স্রোতকে বরফের মতো নিশ্চল বা গোটা একেকটা পাহাড়ও গায়েব করে দিতে পারে। মরা মানুষের ভূতকে আবার জীবিত করে তুলতে পারে। দেবতাদেরকে তাদের আসন থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিতে পারে। জ্বলজ্বলে প্রতিটা তারা নিভিয়ে দেওয়া বা একেবারে নরকের গহীনেও আলো জ্বালানো তার কাছে তুড়ির ব্যাপার।”

“আরে ব্যাটা সক্রেটিস, কী শুরু করলে এসব? নাটক মঞ্চস্থ করছো নাকি? দোহাই লাগে ভাই, পর্দা নামিয়ে এবার সোজাসাপ্টা ভাষায় আসল কাহিনি বলো তো দেখি।”

ও জবাব দিল: “তার ক্ষমতার কয়টা নমুনা লাগবে তোমার? একটায় কাজ হবে? নাকি দুইটা লাগবে? বা তারও বেশি? সে যেভাবে পুরুষমানুষদের পাগলের মতো তার প্রেমে পড়তে বাধ্য করে ফেলে—শুধু যে গ্রিকদের তাও না, ভারতীয়দের, পূর্ব ও পশ্চিম মিশরীয়দের, এমনকি আন্তিপোদিসের বাসিন্দাদেরও—এসব তো তার ক্ষমতার ছিটাফোঁটা মাত্র। তুমি যদি এর চেয়েও বড় বড় কীর্তির উদাহরণ চাও, সেরকম কয়েকটার কথাও বলতে পারব তোমাকে আমি। একদম প্রত্যক্ষদর্শীদের সামনে ঘটেছে সেগুলি। যাই হোক, প্রথমেই একটা ঘটনা বলি। তার এক প্রেমিক একবার অন্য এক বেটির সাথে পরকীয়া করার দুঃসাহস দেখিয়েছিল। মেরো কেবল একটা শব্দ উচ্চারণ করেছে, আর সাথে সাথে একটা বিবরে রূপান্তরিত হয়ে গেছে ওই ব্যাটা।”

“এত জন্তু থাকতে বিবর কেন?”

“কারণ বিবর এমন এক প্রাণী, শিকারীদের হাত থেকে বাঁচার জন্য যে কিনা নিজের বিচি কামড় দিয়ে ছিঁড়ে নদীর তীরে ফেলে রাখে, যাতে শিকারীরা গন্ধ শুঁকে তাকে খুঁজে বের করতে না পারে। মেরো আশা করেছিল যে তার প্রেমিকও এরকম কিছু করতে শেষ পর্যন্ত বাধ্য হবে। তারপরে সরাইখানার ওই বুড়া মালিকের কথাই ধরো। মেরোর প্রতিবেশী ও ব্যবসায়িক প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল ওই লোক। তাকে ব্যাঙ বানিয়ে দিল সে। এখন বেচারা তার সুরার পিপার ভেতর সাঁতার কেটে বেড়ায়। অথবা পিপার তলানিতে ডুবে থাকে আর ভাঙা গলায় নিজের পুরানো কাস্টমারদের ডাক দেয় “আসেন ভাই! আসেন! একবার ভিতরটা ঘুরে যান!” যে উকিল তার বিরুদ্ধে মামলা লড়েছিল, তার শাস্তি হলো ভেড়ার শিং। এখন তুমি যেকোনো দিন আদালতে গেলেই তাকে দেখতে পাবা, কীভাবে সে ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে মামলা লড়ছে। পাণ্ডিত্যের সাথে সব অভিযোগ খণ্ডন করছে আর ওই বিশ্রী শিং দুইটা কীভাবে বাঁকা হয়ে বের হয়ে আছে তার কপাল থেকে!