বর্ণ সাহিত্য পত্রে আপনাকে স্বাগতম। সাহিত্য, শিল্প, সংস্কৃতির কাগজ বর্ণ। আপনার নির্বাচিত লেখা আজই পাঠিয়ে দিন আমাদের ই মেইল এ -Lnrayhan@yahoo.com ।
  • November 11, 2023

এই গল্পটা জীবককে শোনাতে হবে। ঢোঁড়া সাপ কী করে বিষহীন হয়ে গেল।

ঢোঁড়া সাপের একসময় খুব বিষ ছিল। বিষের কারণে ও অহংকারী হয়ে উঠেছিল। মনসা ঠাকুরাণকে ও তেমন পাত্তা দিচ্ছিল না। মনসা ভাবলেন – দাঁড়া, মজা দেখাচ্ছি।

ঢোঁড়া ছিল খুব লোভী। সেটা মনসা ঠাকুরাণী জানতেন। একদিন এক পুকুরপাড়ে ঢোঁড়া সাপ শুয়ে আছে। একটা ব্যাঙ ঝম্প দিয়ে একটা নদীতে পড়ল। ঢোঁড়াও ব্যাঙকে খাবার জন্য জলে ঝম্প দিলো, ব্যাঙকে খেয়ে নিল। তাতে সাপের তৃপ্তি হলো না। মনসা ঠাকুরাণী তখন কতগুলো মায়ামৎস্য সৃষ্টি করলেন। ঢোঁড়া সাপ মাছের পেছনে ছুটল। কিন্তু মাছ ছুটছে তিরের মতো। মাছকে খেতে পারছে না ঢোঁড়া। ঢোঁড়া ভাবল, একটু ভার কমাতে পারলে খুব দ্রম্নত ছুটতে পারবে। বিষের ভারে জোরে ছুটতে পারছে না। ঢোঁড়ার সামনে দিয়ে আরো মাছ ছুটছে। সব মায়ামৎস্য। ঢোঁড়া করল কি, একটা পদ্মপাতায় বিষের থলি রেখে মাছের পেছনে ছুটল। ইতোমধ্যে ঢোঁড়ার বিষ লুট হয়ে গেল। ভীমরুল, বোলতা, বিছে সবাই যে-যা পারল লুট করে নিয়ে গেল। ঢোঁড়া কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে দেখল – পদ্মপাতায় একটুও বিষ নেই। বিষের থলি খালি। সেই থেকে ঢোঁড়া বিষহীন। ঢোঁড়াকে কেউ পাত্তা দেয় না। কেউ সমীহ করে না। ঢোঁড়াকে দেখলে মানুষ ভয় পায় না। লাথি মারে।

কিন্তু জীবকের এখন তো আর গল্প শোনার বয়স নেই। একটা সময় ছিল, যখন জীবককে গল্প শোনাতেন দেবকিঙ্কর। এখন কখন শোনাবেন! জীবক তো সবসময় ব্যস্ত। একটা নার্সিং হোমের সঙ্গে যুক্ত, দুটো পলি ক্লিনিকে যায়, একটা ওষুধের দোকানে বসে। বসে যে বাপে-পুত্রে গল্পস্বল্প করবেন তার উপায় কোথায়। যতক্ষণ বাড়িতে থাকে, কানে ফোন।

দেবকিঙ্কর সেনের পরিবারের একটা ঐতিহ্য আছে। পিতামহ এবং পিতা দুজনেই ছিলেন আয়ুর্বেদাচার্য্য। সাধারণ মানুষ বলে কবিরাজ। দেবকিঙ্কর পাশ্চাত্য ডাক্তারিবিদ্যা পড়েছিলেন। এমবিবিএস। পূবপুরুষের কাছে অর্জিত নাড়ি পরীক্ষা, জিহবা পরীক্ষা, ত্বক ও নখ পরীক্ষা, এমনকি শরীর-নির্গত বায়ুর ঘ্রাণ পরীক্ষা ইত্যাদিতে পারদর্শী। খুব দরকার হলেই ল্যাবরেটরিতে রক্ত-মূত্রাদি পরীক্ষার জন্য পাঠান। গরিব রোগীরা ভিড় করে এখানে। ফি-ও খুব কম। কিন্তু দেবকিঙ্করের পুত্র এই আদর্শে বিশ্বাসী নয়। ও দেবকিঙ্করকে ভাবে বোকা লোক। দেবকিঙ্কর ছেলের নাম রেখেছিলেন জীবক। জীবক ছিলেন প্রাচীন ভারতের বিরাট চিকিৎসক। কায়চিকিৎসা এবং অস্ত্রচিকিৎসায় সমান পটু ছিলেন। জীবক কিন্তু ‘জয়েন্ট’ পরীক্ষায় ভালো ফল করতে পারেনি। ফলে সরকারি মেডিক্যাল কলেজে হয়নি। ডাক্তার পরিবারের ছেলে ডাক্তার হবে না?  – এসব ভাবনা কাজ করল, দেবকিঙ্করের স্ত্রী চিন্ময়ীও প্রায় পীড়াপীড়ির পর্যায়ে গেলেন। ফলে বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ – তথা প্রাইভেট মেডিক্যাল কলেজে একগাদা টাকা খরচ করে এমবিবিএস হয়েছে জীবক। দেবকিঙ্কর বলেছিলেন – তুমি কিছু এডুকেশন লোন নাও, রোজগার করে শোধ করবে। লাখছয়েক টাকা লোন নিতে বাধ্য করেছিলেন, বাকিটা নিজেই দিয়েছিলেন। ছেলে এখন টাকা উশুলের খেলায় মেতেছে। নানাভাবে টাকা রোজগার করে চলেছে। একটা ডাক্তার এই ব্যবস্থায় নানাভাবে টাকা রোজগার করতে পারে।
প্যাথলজির কমিশন, মিথ্যা সার্টিফিকেট, অপ্রয়োজনীয় ওষুধের প্রমোশন – এরকম নানাবিধ। জীবক এসব প্রলোভনের ফাঁদে পড়েছেন। দেবকিঙ্কর এটা চাননি।

দেবকিঙ্করের সামনে একটা কাগজ। একটা তালিকা করছেন –  কী কী কাজ করা দরকার। টু. ডু. কিংবা টাস্ক।

এক নম্বরেই এই গল্পটা। ঢোঁড়ার গল্পটা। কীভাবে বলা যায়। কখন বলা যায়, এসব নিয়ে ভাবেননি। এই গল্পে কাজ হবে কিনা তাও জানা নেই। কাজ হবে না। এসব ওষুধে এই প্রজন্ম ‘ইমিউন্ড’ হয়ে গেছে। বেহুলাপালায় এই অংশটার গান এখনো মনে গেঁথে আছে দেবকিঙ্করের।

তাঁকিয়া বাঁকিয়া ঢোঁড়া গাং পার হয়

মনসা ঠাকুরাণী কৌশল করায়

সিরজিলেন মায়ামৎস্য ঢোঁড়ার সমুখে

মাছের ঝাঁক দেখ্যে ঢোঁড়ার লোলা আসে মুখে

বিষদন্ত খুলে ঢোঁড়া পদ্মপাত্রে রাখে

তারপর ছুট্যে গেল মাছের সম্মুখে

বেশি গিলে খাবে বলে হাঁ করে মুখে

মায়ামৎস্য নাই হায় ঢোঁড়ার সমুখে।

তারপর ফিরে এসেছিল ঢোঁড়া। যে-পদ্মপাত্রে

বিষদাঁত রেখেছিল – সেখানে গিয়ে দেখে

বোলতা ভীমরুল চেলা ও পিঁপড়ি

মৌমাছি কাঁকড়া বিছা নিছে লুট করি।

দেবকিঙ্কর তো এই কবিগান গেয়ে শোনাতে পারেন না আর। কিন্তু এই ভাবনা কী করে ঢোকাবেন জীবকের মনে! কোন ইনজেকশনে? জানেন না। তবে এটা টাস্ক, করতেই হবে।

তালিকার দু-নম্বরে হাড়িভাঙ্গা গ্রামের চপলা হাড়ির হাসপাতাল পরিদর্শনে যাওয়া। অনেকদিন যাওয়া হচ্ছে না। এক গরিব মহিলা এক অদ্ভুত মনোবলে একটা হাসপাতাল তৈরি করছে। ওরা জাতে হাড়ি। ওর ছেলেটি ডাক্তার হয়েছে। কিছু অর্থ সাহায্য করেছেন দেবকিঙ্কর। চাঁদাও তুলে দিয়েছেন কিছু। কতদূর হলো, কেমন হলো দেখতে ইচ্ছা হয়। তিন নম্বরে ইঁদুর লিখলেন। ইঁদুরের বড্ড উপদ্রব। ডায়েরির পুরনো পাতাগুলো খেয়ে নিয়েছে। বাবার লেখা চিঠিও। মারতেই হবে। সামান্য ব্যাপার। ইঁদুরের কল না বিষ, স্থির করা হয়নি। বিষে মরে থাকলে কোথায় মরবে – পচা গন্ধ হবে। মৃতের মাংসের পচা গন্ধ হয় বড়। মৃত আদর্শের? চার নম্বরে সনাতন। এর বাবার এইচআইভি ছিল। সেখান থেকে ওর মা পেয়েছিল এই রোগ। দেবকিঙ্করের রোগী। সনাতন পড়াশুনোয় তুখোড়। ও আমেরিকা গেছে। সনাতনের মাকে দেবকিঙ্কর নিজের বাড়িতেই রেখেছেন। কাজ করে। সনাতন একটা মেল করেছে অনেকদিন। উত্তর দেওয়া হয়নি। সনাতন লিখলেই মনে পড়বে। সেসঙ্গে লীলাবতীকেও পরে চিঠি লিখবেন। চিঠি তো নয়, মেল। লীলাও তো বিদেশে যাবে। লীলাবতী দেবকিঙ্করের মেয়ে। অঙ্কে বড় ভালো মাথা ছিল। ও আবহাওয়াবিজ্ঞান নিয়ে গবেষণা করে। ওর বিষয় ঘূর্ণি। টারবুলেনস। এরপর টাস্ক লিস্টে লিখলেন – চিন্ময়ী। চিন্ময়ী দেবকিঙ্করের স্ত্রী।

চিন্ময়ী লিখে কেটে দিলেন। এ আবার লেখার কী আছে। ওর ব্যাপারটা নিয়েই তো সর্বক্ষণের ভাবনা। কিডনি কাজ করছে না ওর। কিছু তো একটা করতে হবে। এটা লিস্টে রাখার দরকার নেই। আরো কতগুলো ব্যাপার মনে পড়ল। লুডো।

চিন্ময়ী আর সনাতনের মা খেলবে। তোয়ালে। গাড়ির সিটে তোয়ালে নেই বহুদিন। কোথায় গেল কে জানে? কাসুন্দি।

বহুদিন ধরে ইচ্ছা হচ্ছে কুমড়োফুলের বড়া কাসুন্দি দিয়ে…। কুমড়োফুল পাওয়া যায় মাঝেমধ্যে, কিন্তু কাসুন্দি নেই। এরপর লিখলেন – রং।

চেম্বারটায় বহুদিন রং করা হয়নি। ভালো দেখাচ্ছে না।

দেবকিঙ্করকে লাইফগার্ড ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানির রিজিওনাল ম্যানেজার বলল – স্যার, আপনার চেম্বারটা বড্ড শ্যাবি, ইফ ইউ ডোন্ট মাইন্ড, আমরা একটু রেগোভেট করে দেব? আসলে স্যার, আমাদের কোম্পানি নোটিশ করেছে যে, অনেক ডাক্তারবাবু আছেন, যাঁরা একটু আপনভোলা টাইপের, চেম্বারের লুক-টুক নিয়ে অত ভাবেন না, বা ভাবার সময় নেই। আমাদের একটা ফান্ড আছে, আমরা একটা পেশেন্ট-ফ্রেইন্ডলি লুক এনে দি। রং করাটা দেবকিঙ্করের লিস্টে ছিল। করা হয়ে ওঠেনি।
পেশেন্ট-ফ্রেন্ডলি লুক মানে? দেবকিঙ্কর একটু কপাল কুঁচকে জিজ্ঞাসা করলেন, মানে – একটু সুদিং কালার করে দেব ওয়ালে, কাঠের পুরনো বেঞ্চিগুলো পালটে পস্নাস্টিকের হালকা…।

– আর দেয়ালে আপনাদের কোম্পানির প্রোডাক্টের নাম লিখে রাখবেন, তাই তো? দেবকিঙ্কর একটু উঁচু গলাতেই বললেন, তখন ছোট্ট করে জিভ কাটল টাই এবং টাক সমৃদ্ধ ম্যানেজার। একদম না। এটা প্রোডাক্ট প্রমোশনের মধ্যে নয়, এটা বলতে পারেন কোম্পানির সোশ্যাল সার্ভিস।

– তো সোশ্যাল সার্ভিসটা আমার চেম্বারে কেন? দেয়াল চুনকাম-সামর্থ্য আমার তো আছে।

– নিশ্চয়ই আছে স্যার। ডোন্ট টেক ইট আদার সেন্স। আপনি খুব বিজি ডাক্তার, কমিটেড। আমাদের রিপ্রেজেনটেটিভদের কাছ থেকে খবর-টবর পাই। আমাদের একটা ওয়েলফেয়ার ফান্ড আছে। নানারকম সোশ্যাল অ্যাকটিভিটি করে।

– যেমন?

– যেমন, ধরুন কোনো সি-বিচ কিংবা ফরেস্টে গিয়ে ডাক্তারবাবুদের একটা গেট টুগেদার করিয়ে দেয়, হয়তো ডায়াবেটিস বা কার্ডিয়াক প্রবলেম নিয়ে ডাক্তাররা নিজেদের এক্সপেরিয়েন্স শেয়ার করে, কোনো চ্যারিটেবল ডিসপেনসারিকে গ্রান্ট দি…।

দেবকিঙ্কর এ-কথার প্রবাহটা থামিয়ে দিয়ে হঠাৎ সুর নরম করে বলেন, চ্যারিটেবল ডিসপেনসারির ফান্ডিং আছে আপনাদের? রিয়েলি?

অফিসারমশাই বললেন – হ্যাঁ, আছে তো। আপনি এরকম কোনো অর্গানাইজেশনকে রেকমেন্ড করছেন নাকি?

দেবকিঙ্কর এবার কী বলবেন? চপলার ওই হাড়িভাঙ্গার হাসপাতালটার কথা বলবেন নাকি? ওরা টাকা দিলে নিশ্চয়ই হাসপাতালের গায়ে ওদের প্রোডাক্টের নাম লিখে দেবে। তা দিকগে থাক। লিখুক না। নাকি এক্স-রে মেশিনের গায়ে লিখে দেবে ওদের কোম্পানির নাম লাইফগার্ড…। ওরা কি এক্স-রে মেশিন দেবে! না – না -, এত দেবে না। দেবকিঙ্কর আবার জিজ্ঞাসা করেন – আপনারা যে গ্রান্ট দেন বলছেন, তার অ্যামাউন্টটা কেমন?

– এটা ডিপেন্ড করে স্যার। দশ হাজার থেকে দশ লাখও হতে পারে। ভারত সেবাশ্রম সংঘকে একটা এক্স-রে মেশিন দিলো তো সেদিন।

ভারত সেবাশ্রম, রামকৃষ্ণ মিশন – এদের কথাই আলাদা। ওরা ওদের দেবে। হাড়িভাঙ্গা গ্রামে দিতে যাবে কেন?

– আপনি কি কোনো এরকম ডিসপেনসারিকে রেকমেন্ড করছেন স্যার?

দেবকিঙ্কর এদিক-ওদিক তাকালেন। যেন গোপন কথা… বললেন। – হ্যাঁ, ওরকম একটা ভেঞ্চারের কথা জানি, একটা গ্রামের ভেতর একজন মহিলা একটা হাসপাতাল করার চেষ্টা করছেন। আমি বলেছিলাম ওদের যা পারি সাহায্য করব।

ঢোঁড়া সাপটা কিলবিল করে দেবকিঙ্করের কাছে আসে। নিজের বিষ হারানোর গল্পটা ও নিজের পিঠে বয়ে এনেছে। মনসা ঢোঁড়া সাপকে টোপ দিয়ে বিষ নষ্ট করে দিয়েছিল। দেবকিঙ্কর বললেন –   এখন থাক। বলছি না ওদের ডোনেট করুন। বলতে চাইছিলাম –  আমার চেম্বারটার জন্য ভাবতে হবে না কিছু। ও আমি মেরামত করে নেব। আমি তো খেয়ালই করিনি এটা, পয়েন্ট আউট করিয়ে দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।

করপোরেট অফিসার বললেন – আপনার চেম্বারটার সঙ্গে ওটাকে কানেক্ট করছেন কেন স্যার। ওই ডিসপেনসারিটার ডিটেল্স জানিয়ে দিতে বলবেন, আমাদের লোক একবার একটা ইন্সপেকশন করবে। কিন্তু এই কাজটা আমাদের করতে দিন, আমরাই অবলাইজড হবো।

দেবকিঙ্করের মনে হলো, আমি দেবকিঙ্কর সেন। আমার চেম্বারে এতক্ষণ এসব প্যানপ্যানানি অ্যালাউ করিনি কখনো। অনেক আগেই বলে দেওয়া যেত নমস্কার, এবার আসুন। কিন্তু বলা যাচ্ছে না। ঢোঁড়া-সিনড্রোমে আক্রান্ত হচ্ছি নাকি? ঢোঁড়া সাপ হয়ে যাচ্ছি ক্রমশ? পর্দাটা সরালেন দেবকিঙ্কর। পর্দে রহনে দো… পর্দে না ওঠাও…। সবুজ পর্দাটা সত্যিই নোংরা হয়েছে। হারাধনটা যে কী করে…। দেয়ালগুলোও নোংরা। চল্টা উঠেছে, এক জায়গায় পানের পিকও। ইস্। এত নোংরা? না – না -, নোংরা নয়, মলিন। সর্ব অঙ্গে মাখা মলিনতা, তা নিয়ে এতদিন তো ব্যথা ছিল না কোনো…। মনে পড়ল – এটা তো রবীন্দ্রনাথের কোনো গান থেকে ভেসে আসা কথা। কী গান যেন… কী গান… দয়া, দয়া দিয়ে হবে গো মোর চরণ ধুতে। ওই গানটায় কী ছিল – তোমায় দিতে পূজার ডালি বেরিয়ে পড়ে সকল কালি…। কী যে সব কথা, গা শিরশির করে। কে এই তুমি? কার পুজো? ভগবানে বিশ্বাস নেই। তবু কেন এমন হয়?

দেবকিঙ্কর বললেন – আমার পেশেন্টরা অপেক্ষা করছে, আর আপনাকে সময় দিতে পারব না। আমার চেম্বার নিয়ে আপনাদের ভাবতে হবে না, ওটা আমি করে নেব। আপনাদের ধন্যবাদ। আপনাদের ওষুধ আমি লিখি। অ্যামোক্সিসিলিনটা, ফলিক অ্যাসিডটা।

– হ্যাঁ স্যার, লেখেন, অস্বীকার করছি না, কিন্তু এনজাইমটা একদম লেখেন না, ব্রোমোহেক্সেন দেওয়া কফ সিরাপটা, যেটার নাম একজিট নাইনটি, একদম লেখেন না…।

– না, লিখি না তো। কলমটা একবার টেবিলে ঠুকে নিলেন দেবকিঙ্কর। লিখি না কারণ আমার পেশেন্টদের কথা ভাবি। কেন বৃথা ওষুধ দেব। এনজাইমে কিছু হয় না। আর ওই অ্যাকটিভ চারকোল? আপনারা বোঝান ওই চারকোল গ্যাস শুষে নেয়। কেন বাজে কথা বলেন। কফ সিরাপে এতটাই সেডেটিভ আছে, যা খেলেই ঘুম পায়। আমার পেশেন্টরা খেটে খায়। ড্রাউজি থাকার বিলাসিতা ওদের চলে না।

– না স্যার, ওষুধ লেখার কোনো রিকোয়েস্ট রাখছি না আজ। সে আপনি যা ভালো মনে করেন তাই করবেন। আমরা শুধু একটা রাত্তির চাই। একটা স্যাটারডে নাইট। রাত্তিরেই কাজ শুরু করিয়ে দেবো। সানডে তো চেম্বার বন্ধই রাখেন, সেদিনই সব কমপিস্নট হয়ে যাবে। কোনো রিটার্ন চাই না স্যার, আপনাদের মতো ডাক্তারদের সেবা করে কোম্পানির পুণ্যের ঘরে কয়েকটা পয়েন্ট ক্রেডিট হবে, – এটুকুই। ভদ্রলোক টাই মুচড়ে হাসলেন। দেবকিঙ্করও হাসলেন। হাসতে হাসতেই বললেন – হ্যাঁ, সোমবার দিন চেম্বারে এসে দেখব সব ঝকঝক করছে। দেয়ালে লিখে রাখা হিপোক্রেতিস আর স্টুয়ার্ট মিলের কথা দুটো দিয়ে পস্নাস্টিক পেইন্টে ঢেকে গেছে। বাবার ছবিটা নিচে নামানো, আলো ঝলকাচ্ছে, আর ওই আলোর ক্রমাগত চুলকানি আমাকে কেবল অস্বসিত্মতে ফেলতে থাকবে। মানসিক চাপ দিতে থাকবে, বলবে, ওদের থেকে সুবিধে নিয়েছিস, ওদের ঋণ শোধ কর, ওদের বিজনেস দে।

– ওই কোটেশনগুলো দেয়ালে লিখিয়ে রেখেছিলেন কেন? ওগুলো কম্পিউটারে লিখিয়ে বাঁধিয়ে দেওয়া যাবে… ওজন্য ভাববেন না। আর আবার বলি, বিজনেস ইজ নট আওয়ার… ডান হাতের আঙুল পাঁচটা সংলগ্ন করে সামনে এগিয়ে ধরলেন দেবকিঙ্কর। মানে – এবার থামো। গলার স্বর পালটে গেল। বললেন, সরি। সিম্পলি নো। আমি রাজি নই। ডাক্তারের কাজ ওষুধ কোম্পানিকে বিজনেস দেওয়া নয়, রোগীকে সার্ভিস দেওয়া, আর কোনো কথা নয়। নমস্কার।