এম্নে চাইয়া রইছোস ক্যান?
দেখতাছি তোমারে।
আমারে দেহনের কিছু আছে?
হ, আছে। তুমি য্যামনে ধোঁয়া ছাড়ো সোন্দর লাগে।
টানবি?
না।
আরে টাইন্যা দ্যাখ। মনে হইবো সাম্পানে ভাসতেছোস।
কী কও?
রেজিয়া বেগম মিছা কতা কয় না বুজলি?
আসমানের কালা মেঘরে জাদু কইরা এইটার ভেতর ভরছি। না টানলে বুজবি কেমতে কইলজার ভিত্রে মেঘের ধুমা কেমন কইরা ধাক্কা মারে?
কী কও দাদি?
হরে, হাচাই কইতাছি। টানলে দেখবি, ধোঁয়ার স্বাদ কইলজার ভিত্রে কেমনে ঠোক্কর মারে, শইল্যের থাইকা বাতের বেতা আলগা কইরা ছাড়ে।
দাদি! তোমার এমন সোন্দর ছড়া হুনলে কি না টাইন্যা পারি? দ্যাও, টান মারি।
নদীর হাতে ধোঁয়াসমেত চুরুট তুলে দেয় রেজিয়া বেগম। এরপর আবার ছড়া কাটে,
টান মাইরা দ্যাখলো নাতিন বিড়িত ধইরে টান
এমুন টানে আইস্যা পড়বো সাত আসমানের চাঁন।
নদী চুরুট হাতে নেয়। তারপর নরম ঠোঁটে চেপে ধরে। কয়েক টানে খুকখুক কাশে। ঝাঁঝালো ধোঁয়ায় চোখে জল এসে যায়। দাদিকে বলে, মাগো মা! জ্বালাপোড়া আছে এটায়। তোমারে ধরে না দাদি?
তোরে ধরছে? খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে রেজিয়া বেগম। আমারেও ধরছেগো নাতিন! আমারেও ধরছে। তয় চুরুটের আগুন না। ওইটা মালসার আগুন। মালসার আগুন চিনোস? মাটির থালায় তুষ ভইরা আগুন দিলে যেমুন কইরা ধিকিধিকি জ্বলে তেমুন কইরা এই বুকের খানাখন্দডার ভিত্রে কে য্যান আগুন ধরাইয়া দিছে। হেই যে দিছে আইজ পর্যন্ত এই আগুন নিভে নাই গো বুবু! আগুনের থালাডা লইয়া ঘুরি, ফিরি, কাম-কাইজ করি। বেবাগের লগে হাসিফুর্তি করি। আগুন তো নিভে নালো বইন! রেজিয়া বেগম বলতে বলতে হাঁসফাঁস করে আর অনবরত চুরুট টানতে থাকে।
এজন্যই তুমি কথায় কথায় ছড়া কাটো? গান গাও?
চাঁদের দিকে উদাস চোখ রেখে রেজিয়া বেগম কী যেন ভাবে আর দীর্ঘ নিশ্বাস ছেড়ে বলে, নারে বইন, এইজন্য গাই না। পরানডাতে কে যেন বইসা আমারে নিয়া উড়াল মারে। উড়তে উড়তে ভিত্রের মালসার তুষে দাউদাউ আগুন বাইর অয়। ওই দাউদাউ থেইকা কতাগুলান কই। তোরা হুইন্যা কছ ছড়া করি, গান গাই। আমার কী যে অয় ভিতরটায়! এতটুকু বলে রেজিয়া বেগম থামে। দুটি সুন্দর চোখ অনেক দূরে ঠেলে হঠাৎ গান ধরে …
এই পরানে বইসা তুমি দূরে সইরা যাও
আমি যখন আড়াল হইগো কাছে টানতে চাও
পইড়া আছি তোমার সামনে
ক্যান যে এই পরান কান্দে
চক্ষু খুইলা রাখো তবু দেকতে নাহি পাও
এই পরানে বইসা তুমি দূরে সইরা যাও।
আপন মনে গেয়ে যায় রেজিয়া বেগম। নদী মন্ত্রমুগ্ধের মতো শোনে। দাদির গানগুলি যেন কেমন। একদম বুকে ঠেকে। আপনা-আপনি কান্না চলে আসে। সুরের ভেতর কী বিষণ্ন কাতরতা!
গান থেমে এলে প্রশ্ন করে, আইচ্ছা দাদি একখান কথা কইবা?
কী কতা বইন?
দাদা কই? আইজ পর্যন্ত একদিনও তারে দেহি নাই। হে কি মইরা গেছে? হের জন্য কি এইরকম কইরা গান বান্দো?
‘হে কী মইরা গেছে?’ – এই কথা শুনে রেজিয়া বেগমের বুকের মাঝে খামচি মারে কে যেন। কোনো রকমে নিজেকে সামলায়। তারপর হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। আহ! যা হোক কিছু বলার জন্য তাকে আর ভাবতে হলো না। প্রশ্ন থেকেই উত্তর দৌড়ে এসেছে কাছে।
হরে বইন মইরা গেছে।
কত বছর হইছে?
এই যেমুন ধর আমাগো জনাল আবদীন যে বছর হইছে হেই বছরেই ওর বাপ মরছে।
তখন তুমি কই ছিলা?
ছিলাম আমগো বাড়িত।
এই বাড়িত আইছো কবে?
জনালের বাপ মরার পর তোমার দাদা আমারে নিয়া আসছে।
আমার দাদা?
হ, জনাল আওনের আগে আমি তোমাগো বাড়িত কামে আছিলাম।
হের পর তোমার বিয়া হইছে? কার লগে?
রেজিয়া বেগমের বুক ধক্ করে ওঠে। চাঁদের আলোর নিচে ওর ফর্সা ধবধবে মুখ পাণ্ডুর হয়ে যায়। অগ্রহায়ণের শীতে শরীর থেকে চিকন ঘাম বের হয়। এই পুঁচকে মেয়েটি তো কলিজা ধরে টান মেরেছে। কী জবাব দেবে রেজিয়া বেগম দিশা করতে পারে না। তুমি এট্টু এইদিকে বহো, আমি ওইদিককার কাম দেইখা আইতে আছি – বলেই দিলো ছুট।
নদী বসে থাকে। চাতালের চারদিকে অনিদ্রিত অসংখ্য লোক কাজ করছে। সে এসব দেখতে এসেছে। ওর ভালো লাগে। জমিদার জয়েনউদ্দিন খাঁর বড় নাতনি সে। ডিঙ্গাতলা হোসেনপুর গ্রামের বড় জমিদার আয়েতউদ্দিন খাঁর একমাত্র ছেলে জয়েনউদ্দিন খাঁ। পিতার মৃত্যুর আগে জমিদারি প্রথা শেষ হলেও বাপ-দাদার ঐতিহ্যগত জমিদারি ঠাঁটবাট জমি-জিরেত টিকিয়ে রেখেছেন। এখনো নবাবদের পাওয়া উপাধি নিয়ে ডিঙ্গাতলা হোসেনপুর গ্রামে দাপটের সঙ্গে রাজত্ব করে যাচ্ছেন। জয়েনউদ্দিন খাঁ বাবার একমাত্র ছেলে হলে কী হবে নিজে আট ছেলে তিন মেয়ে জন্ম দিয়ে বংশের মুখ উজ্জ্বল করেছেন। নদী বড় ছেলে সুলতান রোকনউদ্দীন খাঁর মেয়ে। তিন ছেলে ও তিন মেয়ের বিয়ে হয়েছে। বাকি আছে আরো পাঁচ ছেলে। ওরা কলেজ-ইউনিভার্সিটিতে পড়ে। জয়েনউদ্দিন খাঁ বুদ্ধিভাবনায় বৈষয়িক। বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় জমিদারি প্রথা বিলোপ হলেও দক্ষতা ও ক্ষমতাবলে নিজ জমিদারি প্রথা টিকিয়ে রেখেছেন।
অগ্রহায়ণ মাস। চারদিকে শীতের গুঞ্জন। বিশাল জমিদারির চাতাল জুড়ে এসেছে নবান্ন। মিষ্টি মধুর শীত বাতাসে ভর করে কুয়াশা নিয়ে আসে। এইসময় বড় ছেলে সুলতান রোকনউদ্দীন খাঁ পরিবারসহ গ্রামের বাড়ি বেড়াতে আসেন। পিঠা-পায়েস খাবেন। বউ-বাচ্চাদের গ্রাম ঘুরিয়ে দেখান আর পূর্বপুরুষের নানারকম কীর্তিগাথা গল্পের মতো বলতে থাকেন। নদী এসব হাঁ হয়ে শোনে। সুলতান রোকনউদ্দীন খাঁ চা-বাগানের মালিক। সিলেটে পরিবার নিয়ে থাকেন। নদীরা দুই বোন, এক ভাই। ভাইটি বড়। ভাইয়ের জন্মের বারো বছর পর নদীর জন্ম এবং ওর ছোট বোন হৃদি নদীর চার বছরের ছোট। নদী বাড়ি এলে রেজিয়া বেগমের পেছনে পড়ে থাকে। জন্মের পর যতবার বাড়িতে এসেছে রেজিয়া বেগমকে এই বাড়িতে কাজ করতে দেখেছে। কত কাজের লোক এই বাড়িতে। নারী-পুরুষে গিজগিজ করে এই বাড়ি। এত কাজের লোকের ভিড়ে রেজিয়া বেগমের দাপট আলাদা। নদীর দাদি লুৎফুন্নেসা খানম এই বাড়িতে যখন বউ হয়ে আসেন এর আট বছর পর নাকি রেজিয়া বেগম এই বাড়িতে আসে। সেই যে এলো আর কোথাও যায়নি। মাঝখানে জয়নাল আবেদীন কাকা জন্মের সময় এক বছর উধাও হয়ে গিয়েছিল। জয়নাল আবেদীন রেজিয়া বেগমের ছেলে। নদীরা জয়নাল আবেদীনকে কাকা ডাকে। রেজিয়া বেগম এই বাড়িতে কাজ করে বেতন ছাড়া। দাদা সরদার জয়েনউদ্দিন খাঁর কাছে আর্জি ছিল, এখানে সে আজীবন কাজ করবে, বিনিময়ে ছেলেটাকে রেখে দিতে হবে আর পড়ালেখা শেখাতে হবে। সব শুনে দাদি লুৎফুন্নেসা খানম রাজি হলেন। রেখে দিলেন রেজিয়া বেগমকে। তৃতীয় সন্তান জন্ম দিয়ে লুৎফুন্নেসা খানম পঙ্গু হলেন। রেজিয়া বেগমের হাতেই লুৎফুন্নেসা খানম হেঁসেল এবং বাহির বাড়ির দায়িত্ব দিয়ে শয্যা নিলেন। সেই থেকে রেজিয়া বেগম এই পরিবারের কর্ত্রীর মতো হয়ে গেলেন। বিছানায় শুয়েই একের পর এক বাকি সন্তান জন্ম দিয়ে লুৎফুন্নেসা খানম শীর্ণ পাণ্ডুর হলেন। এত বড় বাড়ি। এগুলি সামাল দেওয়া কি চাট্টিখানি কথা? ঘরে-বাইরে এমনভাবে সব সামাল দিলো যে, রেজিয়া বেগমকে কেউ আর এই বাড়ির কাজের লোক ভাবে না। সবাই ওর ভেতর লুৎফুন্নেসা খানমের ছায়া দেখে। নদী দাদি বলতেই অজ্ঞান। হবে না? রূপবতী আর মায়াবতী এই নারী জমিদার জয়েনউদ্দিন খাঁর পরিবারের সবাইকে আগলে রেখেছে অপত্য স্নেহে। কথায় কথায় ছড়া কাটতে জানা, গান বাঁধা ও সুর দিতে জানা এই নারী দিগি¦জয়ী বীরের মতো সবাইকে দখল করে আছে। মিহি সুরেলা কণ্ঠ তার। মাঝে মাঝে জয়েনউদ্দিন খাঁর মতি-মর্জি এদিক-সেদিক হলে রেজিয়া বেগমের ডাক পড়ে। রেজিয়া বেগমের ভেতর তখন সূক্ষ্ম চঞ্চলতা দেখা দেয়। চুলে তেল মেখে সিঁথি কাটে। কলাপাতায় সরিষার তেল ঢেলে আগুনের তাপে পুড়িয়ে কালি তোলে। সেই কালি চোখে লাগায়। এরপর থানকাপড়ের ভাঁজ ভেঙে গায়ে চাপায়। চুলে আলগা টার্সেল দিয়ে খোপা বাঁধে। এরপর মুখে পান গুঁজে ঠোঁট রাঙিয়ে মাথায় ঘোমটা চাপিয়ে জয়েনউদ্দিন খাঁর সামনে দাঁড়ায়। যখন দাঁড়ায় রেজিয়া বেগম তার রূপের জৌলুসে জয়েনউদ্দিন খাঁর চোখ ঝলসে যায়। লাল টকটকে ঠোঁট ঠেলে সালাম ঠুকে বলে, হুজুর আমাকে স্মরণ করেছেন। আদেশ দ্যান, কী করিবো?
গান শোনাও রেজিয়া। গান শোনাইয়া আইজ আমারে সুখ দ্যাও। মন বড়ই বিচলিত হইয়া আছে।
জে হুজুর, আপনার যেমুন ইচ্ছা। রেজিয়া বেগম তৎক্ষণাৎ গান বেঁধে সুর তোলে।
আহারে আসমানের চাঁন,
এমন পোড়া কপাল তোর
রূপের বাত্তি জ্বালাইয়া মনু
একলা পুইড়া হইলি খান,
আহারে আসমানের চাঁন।
জয়েনউদ্দিন খাঁর পাশে লুৎফুন্নেসাকে কয়েকজন কাজের মহিলা ধরাধরি করে এনে বসায়।
অচল জমিদারনি ফ্যালফ্যাল চোখে সুরেলা মিহি কণ্ঠের রেজিয়া বেগমকে দেখে ভেতরে ভেতরে পোড়ে। কে যেন কুঠার দিয়ে তাকে কাটে। অসহায় লুৎফুন্নেসার চোখ লকলক করে ওঠে। হিংসা, ঈর্ষায় মৃত পাগুলি জাগাতে চেষ্টা করে রেজিয়া বেগমকে কষে লাথি মারার জন্য। কিন্তু পা জাগে না, তার চেয়ে জেগে ওঠে ভেতরের ক্রূরতা। দাঁতে দাঁত চেপে বলে, হারামজাদি, নটি, মাগি। রং মাখিয়া ঢং দেখাইতেছোস! তহন যদি জানতাম তরে এই বাড়িত রাহি? ঢং দেখাইয়া রং মাখিয়া আমার খাইয়া-পইরা আমার সোয়ামির সামনে কুদস! হারামজাদি, মাগি! লুৎফুন্নেসার এই রোষ অমূলক নয়। শক্ত সামর্থ্যবান সুপুরুষ জয়েনউদ্দিন খাঁ। এইরকম পুরুষের জন্য কেমন জীবনসঙ্গী দরকার তা লুৎফুন্নেসা জানে। নিজের অপারগতা অক্ষমতা দিনরাত কুপিয়েছে তাকে। স্বামীর সামনে হেসে-খেলে-দৌড়ে খলবল না করলে কী পুরুষের মন ভরে? মন ভরাতে রূপই সব নয়। লুৎফুন্নেসা অসাধারণ রূপসী। কিন্তু অচল। পা না থাকলে রূপে কী হয়? রূপের সঙ্গে গান, নাচ, ছড়া কেটে যদি স্বামীর মনোরঞ্জন করা না যায় তাহলে সংসারে ওই নারীর কোনো মূল্য আছে? সেইদিক থেকে রেজিয়া বেগম পরমা নারী। কী নেই ওর? রূপ, ছড়া, গান, সুরের ছলাকলায় জয়েনউদ্দিন খাঁ যে রেজিয়া বেগমে আসক্ত তা কি লুৎফুন্নেসা জানে না? পা অচল হতে পারে চোখের আলো তো মরে নাই। তিনি সব বোঝেন। কিন্তু কিছু করতে পারেন না। মনে মনে বিষ হজম করেন আর রেজিয়াকে কুৎসিত হওয়ার অভিশাপ দেন। নিরুপায়ের অভিশাপ ছাড়া আর যে কোনো অস্ত্র নেই।
জয়েনউদ্দিন খাঁর চোখে রেজিয়ার ঝলক। উড়ে যায় জমিদারের চন্দন তৃষা রেজিয়ার চরণে। তামাকের পাইপ টানতে টানতে বলেন, রেজিয়া কী গান বানাইলা কও! যেমন করে সুর বানছো আমার ঘাটার দিঘিতে ঢেউ উঠছে। রেজিয়া গাও আরো গাও, তোমার গানের সুরে আসমানের চাঁন ফকফকাইয়া উড়ুক। আইজ চাঁনরে ঘরে যাইতা দিবা না। এইরকম ভাবনা বানাইয়া একখান গান বান্ধো তো দিকি? আমি হুনি। ইনাম পাইবা।
রেজিয়া বেগম আরেক খিলি পান মুখে পোরে। সুগন্ধি জর্দার ঘ্রাণ জয়েনউদ্দিন খাঁর কলিজাতে সুবাস ধরায়। জমিদার এক হাতে পাইপ মুখে ধরে আরেক হাতে বুক ডলে।
ওপর-নিচে হাত বোলাতে বোলাতে চোখ বোঁজে। রেজিয়া বেগম সব বোঝে। জানে আজকের এই প্রহর দামি। আজকের এই রাত নীল গুলাবের সুশোভন মিনার। আজ গানের আড়ালে-আবডালে একজন আরেকজনের মন ছোঁবে। আজ রেজিয়া বেগম রেজিয়া বাঈ। সুগোপন সিঁড়ি ভেঙে সুরের জোনাকিরা মিটমিট আলো জ্বেলে উড়িয়ে নেবে সরদার জয়েনউদ্দিন খাঁকে ওর বেয়াড়া বাস্তুভিটেতে। রেজিয়া বেগম জানে, আজকের এই রাতের মর্ম। জমিদার জয়েনউদ্দিন খাঁর বুকের কোথায় ব্যথা, কেন এই ব্যথা তা দ্রাক্ষামতী রেজিয়া বেগম ছাড়া আর কে খোঁজ রাখে? জয়েনউদ্দিন খাঁর আদেশ চাঁদকে ঘরে না পাঠানোর গান বেঁধে শোনাতে হবে। রেজিয়া বেগম অনাস্বাদিত স্বাদে মোহগ্রস্ত হয়ে পড়ে। সামনে ল্যাংচা এক রমণী ওর পাশে বলিষ্ঠ সুঠাম পাহাড়ের মতো শক্ত সামর্থ্য এক পুরুষ বসা। এমন পুরুষের সঙ্গে কী ওরকম রমণী মানায়? যে পুরুষ পাশের রমণীকে পাশেই রেখে বুকে তুলে নেয় দূরাগত ওষ্ঠের ঘ্রাণ। যে-ঘ্রাণ সুগন্ধি জর্দায় ম-ম করে তুলছে বেদেনী প্রহর। রেজিয়া বেগম একপলক তাকায় জয়েনউদ্দিন খাঁর দিকে। পুলকিত দৃষ্টি গোপন বাসনা অতিক্রম করে চলে যায় দেবতা সভায়। এই দৃষ্টি বড়ই পবিত্র ও নির্মল। ওখানে গানের দেবী সুরের ফল্গুধারায় বয়ে আনে কথার ভার। রেজিয়া বেগম গান শুরু করে …
ওরে নয়া চাঁন কী পিরিত শিখাইলি
বহুদেশ ঘুইরা তুই আসমানে নোঙর দিলি
আমি অকালের কোলে বইসা তোরে যত দেখি
মন পারি না বান্ধিতেরে আমার হইলো কী!
তোর কাছে লুকাইতে চাইরে মনের যত ব্যথা
যাইসনারে আমারে ছাড়িয়া চাঁন দিয়ে যা কথা
ওরে আসমানের চাঁন কোথায় বাতাসের ডাল
পাইতাম যদি ধইরা তারে ভাঙতাম খোয়াবের কাল।
রেজিয়া বেগমের গান শেষ হয় আর জয়েনউদ্দিন খাঁর নেশা বেড়ে যায় আরো শোনার জন্য।
অতল হ্রদের আঙিনা কেটে মনডুবুরি সাঁতরে চলে রেজিয়া বেগমের হৃদবাঁওড়ে। রেজিয়া বেগমের উদ্যানজুড়ে কথার রেণু দুলতে থাকে। সুরের খেয়া প্রজাপতির মতো উড়তে থাকে। ওপরে চাঁদের আলো নিচে রেজিয়া বেগমের আলো – দুই আলোয় ভেসে যায় চারপাশ। চাঁদের তো একতরফা আলো। কিন্তু রেজিয়া বেগমের সর্বাঙ্গময় জোছনা, মুকুলিত কথার শোভামালা, সুরের সুনীল সুষমা পৃথিবীর সমস্ত সৌন্দর্যকে মøান করে দিচ্ছে। গলায় অভুক্ত যৌবন কিলবিল করে ওঠে। গান বাঁধে রেজিয়া বেগম আরো,
ও আমার নিধুয়া পরানপাখিরে
কেন এত জ্বালা লাগেরে
এই মন থাকিতে কেন আমি
দরিয়ায় মিছে সাঁতার কাটিরে …
সুরের মোহনায় কথারা আরো হুড়মুড়িয়ে ছুটে আসে রেজিয়া বেগমের জবানে …
আমায় বাসিলিরে বন্ধু ভালো
তবে কেন তোর হৃদয় কালো
এই কথা বল কাহারে জিগাই
যারে জিগাই সেও যায় দূরে
চোখ খুইলা দেখি আমার কেহ নাই।
গান চলতে থাকে। কত রাত হয় কেউ জানে না। গানের মোহন সুরে জমিদারবাড়ির পাইক, পেয়াদা, নায়েব, গোমস্তা সবাই চাটাই নিয়ে উঠানে বসে যায়। কে কোথায় কীভাবে বসেছে কারো হুঁশ নেই। গান শুনতে শুনতে অনেকের চোখ শিথিল হয়ে আসে। বিশেষ করে অন্দরবাড়ির মহিলাদের। যারা দূর থেকে খড়ের স্তূপে বসে গান শুনছিল। গানের সুমধুর সুর ওদের চোখে ঘুম তুলে দেয়। ক্লান্তিময় শরীর সুরের মোহন জাদুতে এলিয়ে পড়ে ওখানেই। সন্ধ্যারাত নাকি মধ্যরাত নাকি শেষরাত কেউ ঠাহর করতে পারে না। গান থামাতে হয় লুৎফুন্নেসার ডাকে। অবশ শরীর নিয়ে হেলান দেওয়া চেয়ারে কতক্ষণ বসে থাকা যায়? আরো আগেই চলে যেতেন। কিন্তু মনের গহিন অলিন্দে ঈর্ষার বিতৃষ্ণা কোথায় রাখবেন? এই গোপন প্রেমিক যুগল তার শান্তি নষ্ট করে দিয়েছে সেটা তো কাউকে বলতে পারেন না। তাহলে করবেনটা কী? পুড়ে মরা ছাড়া গতি আছে?
লুৎফুন্নেসা বিহ্বলিত হয়ে পড়েন। অস্থির লাগে সব। শারীরিক অসুস্থতার জন্য জলসা ছেড়েও যেতে পারেন না, আবার রেজিয়া বেগমকে জয়েনউদ্দিন খাঁর সামনেও রেখে যেতে দ্বিধা। মনে আডাক-কুডাক সতর্ক করে। শেষে নিজ থেকেই বিরক্ত হয়ে বলেন, শুনছেন?
জয়েনউদ্দিন খাঁ ঘোরে ডুবে আছেন। লুৎফুন্নেসার ডাকে চকিতে ফিরে বললেন, কিছু কইবা?