দলবেঁধে কোথাও যাওয়া আনন্দের উৎসব। একা একা ঘুরে বেড়ানো উৎসব হয় না। তখন বিচ্ছিন্ন জীবনের আর্তনাদ ধ্বনিত হয় বুকের ভেতর। ভালো লাগার আনন্দ নষ্ট হয়। সামনে দিয়ে হেঁটে যাওয়া বুনোপাখিও আনন্দের জোয়ারে ভাসায় না। সেজন্য আশিকা কোথাও একা যাওয়ার প্রোগ্রাম মেনে নেয় না। গাছের নিচে চুপ করে বসে থাকলে বুকের ভেতরটা জমাট হয়ে যায়। পাথরের স্তর যেন, যে-স্তর ভেঙে এগোনো কঠিন। সেজন্যে দলের দায় কখনো ওকে বেশি টানতে হয়। এই টানাটাকে ও নিয়মের মাঝে নিয়েছে। মন খারাপ করে না। টাকা জমায় বছরজুড়ে। টের পায় যে এতেও আনন্দ আছে। এর মাঝে নিজের ইচ্ছা পূরণ হয়। ইচ্ছা পূরণ তো স্বপ্নের মতো। আশিকা এমন ভাবনার সঙ্গে হাততালি বাজায়। দু-হাতে গাল চেপে ধরে। কপালে হাত বুলোয়। মধ্যরাতে ঘুম ভেঙে গেলে নিজেকে বলে, ইচ্ছা তুমি ঘুমিও না। জেগে থাক। আমরা হাত ধরে হেঁটে যাব দামতুয়া ঝর্ণার কাছে। সেখানে পাথরের ওপর বসে থেকে জলের স্রোত দেখব। দূরের পাহাড় দেখব। নীল আকাশকে বলব, আকাশ আমার মাথার ওপর ছায়া হয়ে থাক। পেঁজা তুলোর মতো মেঘ পাঠিও আমাকে তোমার কাছে নিয়ে যাওয়ার জন্য। আকাশ তোমাকে আমি বন্ধু মনে করি। তোমার দিকে তাকিয়ে থাকলে আমার সামনে নানা ছবি ভেসে ওঠে। সেই ছবি ধরে আমি মনের ডানায় উড়তে পারি।
ভাবনার মাঝে ঘুম আসে আশিকার। ও গভীর ঘুমে ডুবে যায়। সূর্য ওঠার আগে ওর ঘুম ভাঙে না। ঘুম ভাঙে বেলা ওঠার বেশ পরে। হামিদা বানু দুবার এসে দেখে গেছে আশিকাকে। গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন দেখে ডাকেনি। খেয়াল করেছে ওর চেহারায় আনন্দের জ্বলজ্বলে আভা লেপ্টে আছে। হামিদা বানু বুঝে যায় যে, মেয়েটি কোথাও যাওয়ার জন্য স্থান বাছাই করেছে সেজন্য এমন খুশিতে ভরে আছে ও। মেয়েটাকে কাছ থেকে দেখার এটাই আনন্দ। অনায়াসে বোঝা যায় ওর মনের ছবি। হামিদা বানু আশিকার মনের ছবি দেখে নিজেকে আপ্লুত করে। ভাবে, মেয়ের আনন্দ নিজের মধ্যে নিয়ে দিন কাটানো এক ভিন্ন ধরনের আনন্দ। নিজে ঘুরতে না গেলে কিছু যায়-আসে না। মেয়ের চেহারায় ফুটে ওঠা খুশির আভা তাকে বাইরে ঘোরার আনন্দে ভরিয়ে তোলে। হামিদা বানু আশিকার প্রতি কৃতজ্ঞ হয়।
নাস্তার টেবিলে হামিদা বানু সরাসরি জিজ্ঞেস করে, কী রে কোথায় যাবি বলে ঠিক করেছিস?
ঠিক করেছি? তোমাকে তো বলিনি। তুমি কী করে জানলে?
– তোর চেহারা দেখে। জায়গা ঠিক করলে তোর চেহারা সে-ছবি ফুটিয়ে তোলে।
– বাব্বা। মা গো তুমি দেখছি –
– হয়েছে, হয়েছে থাম। মাকে নিয়ে ভাবতে হবে না।
– তুমি তো আমাকে দেখতেই থাক। কত কিছু দেখতে পাও আমার মধ্যে। নিজের চেহারায় আমি নিজেও এতকিছু দেখতে পাই না।
– নিজের চেহারা তো আয়নায় দেখতে হয়। আয়নায় সবসময় সবটুকু ধরা পড়ে না। আর ধরা পড়লেও নিজের চোখে সেটা দেখা যায় না। অন্যরা দেখতে পায়।
– মা গো, তুমি আমার সামনে একজন দার্শনিক। শুধু স্কুলশিক্ষক না। তোমার দেখার ভিন্ন চোখ আছে। এখন থেকে আমি তোমার ছাত্রী হব।
– নতুন করে কি ছাত্রী হবি? ছোটবেলা থেকে কত কিছু তোকে শেখালাম।
– হ্যাঁ ঠিক। তোমার কাছে শিখতে শিখতেই তো বড় হলাম। এখন যেসব শিখি তা সব পানসে। রুটিরুজির শিক্ষা।
– হয়েছে থাম, থাম। এ-কথা শুনলে মন খারাপ হবে। আমার ক্লাসের ছেলেমেয়েরাও বলবে, আমার কাছে যা শিখছে তা সব পানসে। এমন কথা আর একদিনও বলবি না। শিক্ষকদের অপমান করা হবে।
– মাফ করে দাও মা গো, আর কখনো বলব না। এখন বুঝতে পারছি অনেককিছু না বুঝে বলা হয়ে যায়।
– থাক এসব কথা। ফ্রিজে দই আছে। দেব তোকে?
– না, মা এখন খাব না। বিকেলে খাব। আব্বা অফিসে গেছে?
– হ্যাঁ, বেরিয়ে গেছে। তুই তো জানিস তোর বাবা ঠিক সময়ে বের হতে না পারলে অস্থির হয়ে যায়।
– হ্যাঁ, জানি সময়ের নিয়ম বাবা খুব মানে।
– তুই ইউনিভার্সিটিতে যাবি না?
– যাব। এখনই রেডি হব।
– ক্লাস মিস হবে?
– না, মা ক্লাস মিস হবে না।
– তুই কোথায় ঘুরতে যাবি? ঠিক করেছিস বুঝেছি। জায়গাটা কোথায়?
– বান্দরবানের আলীকদম উপজেলায় যাব। ওখানে একটি চমৎকার ঝর্ণা আছে। ওটার নাম দামতুয়া ঝর্ণা। প্রকৃতির নয়ন ভোলানো দৃশ্য মুগ্ধ করবে আমাদের। মা গো তুমি যাবে আমার সঙ্গে?
– না রে মা, আমার যাওয়া হবে না। স্কুল থেকে ছুটি পাব না। তোর তো দলবল আছে।
– হ্যাঁ, তা আছে। আজ ওদের সঙ্গে বসব। যাই গোসল করে নিই।
খাবার টেবিল ছেড়ে একছুটে নিজের ঘরে যায়। বাথরুমে ঢুকে শাওয়ার ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দামতুয়া ঝর্ণার অনুভব ওকে
আপ্লুত করে। মনে হয়, এই সকালবেলা শাওয়ারের ঝরে পড়া পানি ওকে দামতুয়া ঝর্ণার ছোঁয়া দিচ্ছে, তবে প্রকৃতির অনুভবের মাত্রা দিতে পারে না। নেট থেকে এই ঝর্ণার দারুণ ছবি বের করেছিল ও। ছবির দিকে তাকিয়ে থেকে গুনগুন করেছিল। একটু আগে নিজেকে শাসন করেছে। এমন নানামুখী অনুভব ওকে বিভিন্ন পথে হাঁটায়। এখন গায়ের ওপর গড়িয়ে পড়া পানির স্রোত ওর দেখা দামতুয়া ঝর্ণার অবিকল ছবি হয়ে বাথমরুমের ছোট পরিসর বিশাল করে তোলে। চারদিকের দেয়াল ওর সামেন পাহাড়ের ছবি হলে ভেনটিলেটারটা ঝর্ণা যেন। মাথার ওপর থেকে পানি পায়ের নিচে গড়িয়ে এলে সেটা সমুদ্র হয়ে যায়। আমি সমুদ্র ভালোবাসি মা। কতবার তো কক্সবাজার গিয়েছি। সমুদ্রে পা ডুবিয়ে বসে থেকেছি ঘণ্টার পর ঘণ্টা। আমি তো প্রকৃতির কন্যা। প্রকৃতির ভেতর থেকে উঠে আসা দিনের সঙ্গী হতে চাই। একই সঙ্গে পাব আদিবাসী মুরং জনগোষ্ঠীকে। ওদের কাছে গিয়ে দাঁড়াতে পারলে আমার দিনগুলো পাহাড় আর বনের মতো সবুজ হয়ে যায়। সাগরের মতো নীল হয়ে যায়। ঝর্ণার মতো শুভ্র হয়ে থাকে। পাখির মতো উড়ে যায় আকাশে। মেঘের মতো ভাসমান ফুল হয়। আমার নানা বিস্তার ঘটে মা গো। আমার বন্ধুদের দেখি প্রজাপতির মতো নিষ্পাপ সুন্দর। ওরা আমার সামনে ছেলে আর মেয়ে থাকে না – ওর শুধুই আনন্দ হয়। শাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়ে হাত-পা ছুড়ে পা দাপায়। পায়ের নিচে জমে থাকা পানি থেকে ছপছপ শব্দ হয়, যেন ও কোনো এক খালের ভেতর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। পায়ে ছলকাচ্ছে পানি। পানির শব্দ ঝর্ণার গড়িয়ে পড়া স্রোতের মতো দু-কান ভরিয়ে দিচ্ছে। মনের আনন্দে উচ্ছ্বসিত হয়ে নিজেকে উন্মাতাল হতে দেখার অনুভব ওকে ভরিয়ে রাখে। ওই ঝর্ণার আশেপাশে থাকে মুরংরা। ওদের ভাষায় দাম শব্দের মানে মাছ আর তুয়া শব্দের মানে বাস করার শেষ জায়গা। মুরং নারীদের আমি ঝর্ণাধারা বলব। ওখানে গেলে ওদের সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব হবে। আর আমার বয়সী যারা থাকবে তারা হবে ঝর্ণার গান। কীভাবে পারবে? এমন ভাবনাও তো বোকামি। ঝর্ণা পাহাড়ি বনভূমির সোনালি উৎস। আহারে কী আনন্দ! আশিকা আনন্দে শাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়ে দু-চার লাফ দেয়। মাথা ঘাড়ের পেছনে হেলিয়ে মুখজুড়ে পানির ছোঁয়া লাগায়, কিন্তু তাতে প্রাকৃতিক ঝর্ণার ছোঁয়াটি কোনোভাবে অনুভবে আসে না। পরক্ষণে নিজেকে শাসন করে বলে, এসব আমার পাগলামি। নিজের সঙ্গে পাগলামি করছি। হাত বাড়িয়ে শাওয়ার বন্ধ করে। আবার খুলে দেয়।
বাথরুমের আয়নার সামনে ভেজা চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে ওর ভেতরে নানামুখী চিন্তা ছড়াতে থাকে। ভাবে, প্রকৃতি ও মানুষের সঙ্গে ভালোবাসা গড়ে তোলা আমার জীবনদর্শন হবে। জীবনভর এই দর্শন অনুযায়ী কাজ করব। পাঁচ বছর আগে কুয়াকাটায় গিয়ে দেখেছিলাম ওখানকার সমুদ্রসৈকত সুন্দর করে গড়ে তোলা হয়নি। এই পাঁচ বছরে হয়তো কিছু পরিবর্তন হতে পারে। যদি না হয় তাহলে পটুয়াখালীর জেলা প্রশাসকের সঙ্গে দেখা করব। এই সমুদ্রসৈকত সুন্দর করার জন্য পাঁচশোজনের স্বাক্ষর নিয়ে একটি দরখাস্ত নিয়ে যাব।
আমি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জন্য কাজ করব। ওদের শিশুদের মাতৃভাষা শেখানোর জন্য ছোট ছোট স্কুল করতে হবে। ওদের মাতৃভাষা যেন বিলুপ্ত না হয়। যেখানে গেলে যে কাজ হবে সেখানে গিয়ে চেষ্টা করব। তার আগে সরকারি চাকরিতে ঢুকব। পরক্ষণে নিজেকে শাসন করে, বেশি বেশি ভাবছিস আশিকা। নিজেই নিজেকে উত্তর দেয়, নারে আশিকা, বেশি বেশি ভাবছি না। এটা আমার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা। যেখানেই চাকরি করি না কেন, পাশাপাশি এসব করব।
আয়নার দিকে তাকিয়ে থাকে। নিজের চেহারা দেখে। চুল আঁচড়ানো হয়েছে। কিন্তু নিজের চেহারায় কিছু খুঁজে না পেয়ে দরজা খোলে। প্রায় দুই ঘণ্টা বাথরুমে কেটে গেল।
হা-হা করে হেসে ওঠে আশিকা। হাসতে হাসতে শাওয়ার বন্ধ করে। তোয়ালে দিয়ে গা মুছে জামা পরে বের হলে দেখতে পায় বাথরুমের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন মা।
হামিদ বানু ভুরু কুঁচকে বলে, এতক্ষণ লাগিয়েছিস কেন গোসল করতে? ভিজেভুজে একসার করেছিস? ঠান্ডা লাগলে –
– কিছু হবে না মা গো। আমি শাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়ে ঝর্ণার শব্দ শুনছিলাম। মুরং মেয়েদের সঙ্গে বন্ধুত্বের কথা ভাবছিলাম। শাওয়ার আমার কাছে ঝর্ণার মতো লাগছিল। ভিজতে ভিজতে অনেক মজা করেছি।
– পাগলামি করার আর জায়গা পাস না, না?
– মা গো মানুষের পাগলামিও থাকতে হয়। পড়ালেখার চাপ থেকে ছুটি পাওয়া যায় পাগলামি দিয়ে।
– কত কী যে তুই ভাবতে পারিস আমার মেয়ে –
– ভেবেই জীবন উড়িয়ে দেব। মা গো আমাকে আমার মতো থাকতে দাও।
– উড়িয়ে দিবি? উড়িয়ে দেওয়ার মানে কী?
– আমি তোমাকে বোঝাতে পারব না মা। ওটা আমার চিন্তায় থাকুক।
– ঠিক আছে থাকুক। কিন্তু আমার মরার আগে জীবন উড়াবি না। তাহলে আমি মরেও শান্তি পাব না।
– এমন কথা বলো না মা গো।
– তুই বলতে পারলে আমি পারব না কেন? তুইও আমার সামনে এমন করে আর কথা বলবি না।
– হ্যাঁ, মা, একদমই বলব না। যে-কথায় তুমি দুঃখ পাবে, সে-কথা কেন বলব আমি।
হামিদা বানু এক মুহূর্ত চুপ থেকে বলে, কখন বের হবি?
– এক্ষুনি মা গো। যাই রেডি হই।
– রেডি হওয়ার সময় আবার ঝর্ণা মাথায় ঢুকবে না তো?
হা-হা করে হাসতে হাসতে আবার আশিকা বলে, ওটা তো মাথায় ঢুকেই আছে। তবে হাতে সময় কম। সেজন্য ঝর্ণার পানিতে ডুবব না। ঝর্ণার পানি ঝরঝরিয়ে ঝরে পড়ে যাবে। একদিন তোমাকে নিয়ে যাব পাহাড়ি ঝর্ণার কাছে। দুজনে একসঙ্গে ভিজব। তোমাকে আমি জড়িয়ে ধরে রাখব মা গো।
– তোর বাবাকে নিবি না?
– হ্যাঁ, হ্যাঁ, বাবাকেও নেব। ইস কেন যে বাবার কথা বললাম না। বাবা অফিস থেকে ফিরলে বাবকে যাবার কথা বলব। তুমি একটুও মন খারাপ করবে না।
মাকে জড়িয়ে ধরে কপালে চুমু দিয়ে নিজের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে আশিকা। জানালার পর্দা টেনে কাপড় বদলায়। গুনগুন শব্দে গানের বাণী ছড়ায়। মাঝে মাঝে কণ্ঠস্বর উঁচু করে, যেন বাইরে থেকে মা শুনতে পায়। মায়ের একটি প্রিয় গান – ‘অন্তর মম বিকশিত কর অন্তরতর হে – নির্মল করো, উজ্জ্বল করো, সুন্দর করো হে – জাগ্রত করো – উদ্যত করো – নির্ভয় করো হে – মঙ্গল করো, নিরলস নিঃসংশয় করো হে।’
এই কয় লাইন গাইতে গাইতে শাড়ি পরা হয়ে যায়। ভাবে, দরজা খুলে দিলে মা গানের পরের বাণী সরাসরি শুনতে পাবে। ও চলে গেলে মা একা হয়ে যাবে। এক মেয়ে নিয়ে তার সংসার। ওর পরে দুটো ছেলে হয়েছিল। দুজনই জন্মের সঙ্গে সঙ্গে মারা যায়। তারপর আর সন্তানের কথা ভাবেনি। স্কুলের চাকরি নিয়ে ব্যস্ত থেকেছে। আশিকার কখনো মনে হয় মায়ের সঙ্গে ওর সম্পর্ক বন্ধুত্বের। মা ওর প্রাণের বন্ধু। মায়ের সঙ্গে যে-কোনো বিষয় নিয়ে আড্ডা দেওয়া যায়। গান গাইতে গাইতে আর একটু সময় যায় – ‘যুক্ত করো হে সবার সঙ্গে, মুক্ত করো হে বন্ধ – সঞ্চার করো সকল কর্মে শান্ত তোমার ছন্দ – চরণপদ্মে মম চিত্ত নিস্পন্দিত করো হে – নন্দিত করো, নন্দিত করো, নন্দিত করো হে।’
শেষ পঙক্তি গাইতে গাইতে আশিকা দ্রুত বেরিয়ে আসে। দেখতে পায় মা ডাইনিং রুমের জানালায় পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দৃষ্টি সরাসরি ওর ঘরের দরজার ওপর। মায়ের আজকে কী হয়েছে? কেন ওকে নিয়ে মায়ের এমন ব্যাকুলতা? দুটো সন্তান হারিয়েছে বলে একমাত্র জীবিত সন্তানের হৃৎপিণ্ডের টুনটুন ধ্বনি আজ বোধহয় তাকে ছন্নছাড়া করে ফেলেছে!
মেয়েকে দরজা খুলতে দেখে এগিয়ে আসে হামিদা বানু। মাথায় হাত রেখে বলে, এমন সুন্দর গানটি ঠিকমতো শুনতে পাইনি। তুই কখন ফিরবি? বাইরে বেশি সময় না কাটিয়ে তুই আমাকে সময় দিবি মা রে।
– আমি সন্ধ্যার আগেই ফিরব। আমি ফিরে এসে তোমাকে আর বাবাকে গান শোনাব মা।
– তোর বাবা বলেছে আজকে আমাদের নিয়ে বাইরে খেতে যাবে। তুই যে রেস্তোরাঁয় যেতে চাইবি সেখানে যাবে।
– হুররে – হুররে – মজা হবে। আমি বিকেলের মধ্যে ফিরে আসব। আমি চায়নিজ রেস্তোরাঁয় যাব।
– দেরি করিস না মা। তাড়াতাড়ি আসিস।
– তোমার আজকে কী হয়েছে মা? তোমার মন খারাপ কেন?
– তুই তো জানিস মাঝে মাঝে আমার এমন হয়। মরে যাওয়া ছেলে দুটোর চেহারা আমার সামনে আটকে থাকে। ওরা আমাকে বলে, মা গো আমাদের দুধভাত দাও। খিদে লেগেছে।
– আজকে তেমন লাগছে?
– হ্যাঁ, লাগছে। কোনো কাজে মন বসাতে পারছি না।
– তাহলে আমি বাসায় থাকব?
– না, না তুই যা। তোর ক্লাস আছে না। আর আমার এমন লাগলে আমি তো কারো সঙ্গে কথা বলি না। আমার একা থাকাটাই জরুরি হয়। আমি নিজের ভেতর থেকে কথা খুঁজে বের করি।
– মা গো, তাহলে আমি এখন যাই?
– যা মা। তাড়াতাড়ি যা। তোর দেরি হয়ে গেল নাকি?
– বেরিয়ে একটা রিকশা পেয়ে গেলে আর দেরি হবে না। যাচ্ছি।
দরজা খুলে বেরিয়ে যায় আশিকা। বাড়ির সামনেই রিকশা পায়। অল্প সময়ে ইউনিভার্সিটিতে চলে আসে। মনে মনে ভাবে, কপাল ভালো যে ট্রাফিক জ্যাম নেই। মনিরুজ্জামান স্যারের ক্লাস শেষ করে বন্ধুদের নিয়ে টিএসসির মাঠে বসে পড়ে আশিকা। গোল হয়ে বসে থাকা সবার মাঝে একগাদা বাদাম রাখে ও। বলে, বাদাম খাব আর গল্প করব।
– গল্প কিসের, তোর প্ল্যানের কথা বল। আমি তো তোর ই-মেইলে দামতুয়া ঝর্ণার বর্ণনা পড়ে মুগ্ধ হয়ে গেছি। কবে যাব এই অস্থিরতায় ভুগছি।
হাসিতে উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে সেঁজুতি। বেশ শব্দ করে হাসতে থাকে।
আসিফ খেঁকিয়ে ওঠে।
– এত হাসির কী হলো সেঁজুতি?
– খুশি, খুশি। নিজের দেশকে নতুন করে দেখার খুশি। আমি তো আশিকার মতো দেশের আনাচে-কানাচে ঘুরিনি। এবারই প্রথম বাবা-মাকে ছাড়া যাচ্ছি।
– এতদিনে তুই বড় হয়েছিস। আমরা বুঝে গেলাম যে এক মাস আগেও তুই খুকি ছিলি।
– ফাজলামি করবি না আসিফ।
– মোটেই ফাজলামি করছি না। খুকিকে খুকি বলছি মাত্র।
– ঢং দেখানোর জায়গা পাস না তুই। সবার সঙ্গে এমন খারাপ ব্যবহার করিস। মতিগতি ঠিক রাখতে পারিস না। মনে হয় না তুই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িস।
– আমি মাত্র একটা কথা বলেছি। আর তুই কতগুলো কথা বললি।
– হয়েছে, হয়েছে তোরা থাম। বাদাম খেতে শুরু কর। তাহলে এমন কথা বন্ধ হবে। এসব কথা শুনে আমাদের মন খারাপ হচ্ছে।