ঢাকা শহরটা জেগে ওঠার আগেভাগে সূর্য এর স্বপ্নিল আভা উপরমুখী উঠে যাওয়া ইটপাটকেলের জবুথবু অথচ দাপুটে দালানকোঠার ওপরকার ঝুলন্ত আস্তরণের বাধাবিপত্তি এড়িয়ে সন্তর্পণে, অনেকটা যেন সস্নেহ পরশ বুলিয়ে এসে পড়তে থাকে, জমতে থাকে ধানম–র চিলতে লেকের পশ্চিম পাড়ের জবরদখল করা বেঢপ পস্নটে মাথা তুলে দাঁড়ানো বিল্ডিংয়ের চতুর্থতলার ঝুলবারান্দার শিউলির বাবার সযত্নে লালিত মাটির টবের নানা রঙের তরতাজা ফুলের পাপড়ি-পাতা-গাছগাছালির সমারোহে। খানিকটা ওপরের অর্কিডের ঝুলে থাকা সুচারু লতানো ডালপালার ছড়ায়ও।
আসন্ন পৌষের সকাল। শীত মাত্র জমতে শুরু করেছে আটঘাট বেঁধে। সকালি সূর্যের আলোতে সোনারং। এই সোনালি রোদের সকাল শিউলির যে বড় চেনা। তার বাবা এমনসব সকালেই উঠে যেতেন। খুন্তি-কাঁচি হাতে। শিউলি ধড়ফড়িয়ে উঠে বাবাকে প্রায়ই এক কাপ চা করে দিতে চাইতো।
বাবা সুখের হাসি হাসতেন।
‘পাগলি মেয়ে, রোদ আর একটু চড়ে গেলে শিউলি ফুলের রাতের জমা শিশিরের বিছানো নরম রেশ যে আর থাকবে না। উবে যাবে। রোদে ফুলচর্চা, গাছগাছালির যত্ন হয় না।’
একটু থেমে মৃদু হেসে আবার শিউলির বাবা বলেন, ‘বরং কাজ সেরে এসে নিশ্চিন্ত আয়াসে চা নিয়ে বসা যাবে। দৈনিক পত্রিকার পাতা খুলে ধরা যাবে। চোখের সামনে। আজগুবি অস্বাভাবিক সব ঘটনাপ্রবাহে। হত্যা-মৃত্যু … এই তো!’
বাবার বেশি আশকারা পাওয়া একমাত্র মেয়ে শিউলি বিরক্তি চেপে বলে ফেলতে ছাড়ে না।
‘তুমি কি সবকিছুতে আবছায়া-অন্ধকারই দেখো? আমাকে যে তুমি কোনো দিন ভালো করে দেখলে না?’
‘কেমন! শিশিরভেজা ফুলের মতো শিউলি মায়ের কোনো আবদার কি আমি সজ্ঞানে এড়িয়ে গেছি?’
‘হ্যাঁ গেছো। আমি যে তোমাকে এক কাপ করে দিতে চাইলাম। সাত-সকালে উঠে।’
‘আচ্ছা চা রেডি করো। আমি আসছি বলে।’
খুন্তি-কাঁচি হাতে এগিয়ে যেতে যেতে শিউলির বাবা আপনমনে বলে যেতে থাকেন,
‘গোলাপ-গন্ধরাজের আঙিনায় আমার যে বড় লোভ। আর ঝাউবনের ছন্দিল উপরমুখী উঠে যাওয়ার মহড়া থেকে আমি যে চোখ ফেরাতে পারি না।’
আজ শিউলির মনে পড়ে, বাবা সময় পেলেই বারান্দায় গিয়ে বসতেন। বসে একবার তিনি আকাশের রং দেখতেন। আর একবার ওপর থেকে চোখ নামিয়ে আনতেন তিনি। তিনি দেখতেন নিচের ক্রমেই সরু হয়ে যাওয়া লেকের জলজ পরিসর, যার এক অংশে কষ্টেসৃষ্টে ভেসে আছে কিছু পদ্মপাতা। সেখানে কালেভদ্রে ফোটে দু-চারটি তরতাজা পদ্মফুলও। তবে তা টিকে থাকেনি বেশিক্ষণ। লোকজনের চোখের আড়ালে নয়, উপস্থিত সবাইকে দেখিয়েই ছিনতাই হয়ে যেতো সেইসব জল থেকে খানিক উঠে থাকা ফুল সব। বিনষ্ট হয়ে যেতো পুরো জলজ-চত্বরটি। এ পরিস্থিতি হলে শিউলির বাবা বেশিক্ষণ সেখানে বসে থাকতে পারতেন না। হালকা মাথা নেড়ে সেখান থেকে উঠে যেতেন। তিনি তখন ভীত-সংকুচিত। শিহরিত। তিনি ভাবেন, এইমাত্র যেন নিষ্পাপ কোনো অপ্সরা সুন্দরী দানবীয় কারো চরম নিষ্পেষণের শিকার হয়ে গেল। জলজ ঢেউয়ের নিরন্তর চাপা কান্না হয়ে।
খানিক পরে আবার ফিরে এসেছিলেন শিউলির বাবা। শিউলিও ততক্ষণে চা-ক্র্যাকার্স হাতে তার পাশে এসে বসার সুযোগ পায়। বাবা তখন বলেন, ‘মা তুমি একটু বসো। মাত্র গত সন্ধ্যায় অফিস থেকে ফেরার সময় গোলাপের চারাটা এনেছি। তা টবে একটু গুছিয়ে নিই।’
শিউলির রাগ তখন উপচে পড়ে।
‘তোমার তো ওই একটাই কথা। কাজটা একটু সেরে নিই। আমি প্রতিদিনকার ওই একই বাক্য শুনবো না আজ। তুমি নড়বে না একটুও। এই নাও চা। কোন সকাল থেকে খালি পেটে। আবার বলো, আজকাল মাঝে মাঝে পেটটা – না বুকটা জানি একটু একটু ব্যথা করে। ডাক্তার দেখানোরও সময় নেই তোমার।’
‘দে চা দে … পাগলি মেয়ে।’
সময় বাঁচানোর জন্য পিরিচে গরম চা ঢেলে মুখে তোলে শিউলির বাবা। আর হাসে।
‘শোন … পাগলি মেয়ে … লেকের পদ্মফুল যে লোপাট হয়ে যাচ্ছে সবার চোখের সামনে দিয়ে।’
‘তাতে তোমার কী?’
‘দায়টা আমার নয়তো কার? আমার চোখের সামনে দিয়ে সেই ডাকাতিয়া লোকজন যদি আমার শিশিরভেজা শিউলিকে উঠিয়ে নিয়ে যায় কোনোদিন?’
শিউলি বাবার কথা অনুসরণ করে হাসে। পরে রাগও হয়।
‘কেন, তোমার বাড়িতে কি জায়গার অভাব হয়েছে! তুমি কি চাও না, আমি থাকি তোমার এখানে। তোমার সঙ্গে সারাটা জীবন।’
‘আমি তো তাই চাই। কিন্তু তুই কি চিরকাল আমার এখানেই …। রাজপুত এসে গেলে তুই ঠিকই তার ইশারার জোয়ারের জলে ভেসে যাবি।’
শিউলির আজ মনে পড়ে, কিছুক্ষণ চুপ থেকে কেঁদে ফেলেছিল সে।
‘দেখো বাবা আমি তোমাকে ছেড়ে কোথাও যাবো না। জোয়ার-টোয়ার আমি বুঝি না।’
‘ঠিক আছে মা তোকে বুঝতে হবে না।’ বাবা পকেট থেকে রুমাল বের করে তার চোখ মুছিয়ে দিয়েছিলেন সেদিন।
পিরিচে নয়, একটু সময় নিয়ে চায়ের কাপে চা শেষ করেন শিউলির বাবা।
‘হ্যাঁ কাপ-পিরিচ পাশে রাখো। বলো নতুন গোলাপ গাছের বয়ান।’
‘আমি সচক্ষে পড়িনি। ফুল-বিক্রেতার কাছে শোনা। সে বলল, পৃথিবীতে বছরপ্রতি চারশো থেকে পাঁচশো নতুন জাতের গোলাপ-সমন্তানের জন্ম হয়। গোলাপচাষিরা এগুলো তৈরি করে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণে। তখন সেগুলো যায় ব্রিটিশ মিউজিয়াম বা অন্য কোনো ফুল-বিশেষজ্ঞ প্রতিষ্ঠানের কাছে। সেখানকার বিশেষজ্ঞ দল চুলচেরা বিশেস্নলষণ-বিন্যাস করে দেখে তখন। এ-ফুলটা নতুন জাতের, নাকি এতে কোনো ভেজাল-গুমর রয়েছে।
এটা আন্তর্জাতিক সর্বজনস্বীকৃত একটা প্রথা। ফুলওয়ালা আরো জানিয়েছে, বর্তমান বিশ্বে গোলাপ প্রজাতির সংখ্যা ৬,৫০০-এর মতো।’
শিউলি প্রায় চমকে ওঠে, ‘কী বললে … কত? আমি তো শুধু দেখি, লাল-সাদা-গোলাপি … এই তো।’
‘কেন এই যে তোমার এই ছোট্ট শূন্যের উদ্যানেই তো এর চেয়ে বেশি রকমের গোলাপ রয়েছে। কাল যে-কলমটা এনেছি সেটার ফুল ফুটলে দেখবে এর রং হবে সূর্যমুখীর মতো উজ্জ্বল হলদে।’
‘বাবা তুমি কী-সব অদ্ভুত কথা বলো?’
‘মা আরো অদ্ভুত লাগবে তোমার কাছে যেদিন দেখবে এই সূর্যমুখী গোলাপ ফুটে আছে ঠিক তোমার গায়ে-হলুদের দিনে …।’ বলে হা-হা-হা করে হাসতে হাসতে তাঁর গড়িয়ে পড়ার অবস্থা।
এমনসব নিরীহ আহ্লাদ-আবদারে, হাসি-তামাশায় ও অফুরান ভালোবাসায় ভরেছিল মেয়ে-বাবার জীবন-সংসার।
দুই
এমনি ধারায় চলতে চলতে কত কী ঘটে গেল এ-সংসারে।
দিনটি ছিল অনিয়মিত বন্ধের। শিউলির বাবা লেকের এপার-ওপারের কোনো সরকারি সংস্থার লাগানো বকুল, শিউলি, কৃষ্ণচূড়া, কদম, নিম আরো নানা জাতের গাছগাছালির দেখভাল, আদর-যত্ন করে সন্তুষ্টচিত্তে বাড়ি ফিরছিলেন। হাতে তার খুন্তি-নিড়ানি-কাঁচি। এ হাউজিং কমপেস্নলক্সের ঘোরানো সিঁড়ি ভেঙে তিনি উঠছিলেন তার চতুর্থতলার ফ্ল্যাট বরাবর। লিফট ধরে ওঠা তার অপছন্দ। চার সিঁড়ি ভেঙে পঞ্চম সিঁড়িতে পা দিতে গিয়ে কিনি কাত হয়ে পড়ে যান নিচে। দারোয়ান-সুপারভাইজার দৌড়ে এসে তাকে টেনে ওঠাতে গিয়ে সুবিধা করতে পারেনি। তার চোখ ততক্ষণে উলটে গেছে। ডান হাত তার বুকের বাঁ-পাশটায় চেপে ধরা।
বাঁ-হাতে তখনো সেই কাঁচি-খুন্তি।
সুপারভাইজার তৎক্ষণাৎ শিউলিদের বাড়িতে ফোন দেয়। শিউলির মা তেমন কিছু বুঝতে না পেরে নিজেকে সামান্য গুছিয়ে নিচে নেমে আসার আগেই গ্রাউন্ড ফ্লোরের একতলা-দোতলার বাসিন্দারা নেমে এসে তৎক্ষণাৎ শিউলির বাবাকে কাছের হাসপাতালে নিয়ে যায়। ইমার্জেন্সি ডিউটি ডাক্তার সামান্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে হতাশা প্রকাশ করেন।
‘ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক। কিছু করার নেই।’ দুহাত ছড়িয়ে ডাক্তার বিনীত হয়ে চলে গেলেন।
কলেজের কী একটা উপলক্ষ ছিল। শিউলি ছোট চাচার ফোন পেয়ে তড়িঘড়ি করে বাড়ি ফিরে দেখে ঘটনা অন্যরকম। ফোনে চাচা অতশত বলেননি তাকে।
এখানকার ময়মুরুবিবরা শেষকৃত্য কার্যক্রমের সুবিধার জন্য শিউলির বাবার মরদেহ গ্রাউন্ড ফ্লোরেই খাটলা সাজিয়ে রাখার পক্ষপাতী ছিলেন। কিন্তু মেয়ে-মায়ের কান্না-বিলাপে তারা মরদেহ তাদের ফ্ল্যাটে নিয়ে তোলেন। তারা তাকে জীবিতের মতোই সেবা-শুশ্রূষা, আদর-যত্ন করতে থাকে। সঙ্গে কান্না-বিলাপও চরম রূপ ধারণ করে। একপর্যায়ে শিউলি সেদিন জ্ঞানও হারিয়ে ফেলে।
দুপুরের পরপর শিউলিদের আত্মীয়স্বজন এসে যায়। এ পর্যায়ে শিউলি-শিউলির মায়ের অবস্থা দেখে ছোট চাচার নেতৃত্বে কতিপয় সিদ্ধান্ত নিতে হয়। এ পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার তেমন বিশেষ কিছু থাকেও না। জানাজার সময় ও কবরস্থ করার স্থান-সময় এই তো।
আসরের নামাজের পর জানাজাশেষে খাটলাসহ শিউলির বাবাকে বনানী গোরস্তানে সমাহিত করার আগে নিয়ে এসেছিল তাদের হাউসে। শেষবারের মতো কাফনের মাথার মুঠি খুলে দেওয়া হয়েছিল। অনেকের সঙ্গে প্রায় কোলে তুলে আনা হয়েছিল শিউলি ও তার মাকে। তখন তারা কতদূর কী দেখল বোঝা গেল না। তাদের চোখ ছিল জলে ভরা বন্ধ, অন্ধকারাচ্ছন্ন। তাদের কণ্ঠে ছিল ভাঙা গলার কান্নার রোল – মাতম। শিউলির মা মাথার চুল ছিঁড়ছিলেন। টেনে টেনে।
শিউলির বাবা ও তার ছোট ভাই সচ্ছল সংসারের আদর-আবদারেই বড় হয়েছিলেন। তাদের বাবা ঢাকায় চাকরি করতেন। বেসরকারি এক বাণিজ্য সংস্থায়। দুই ছেলেকে নিয়ে তাদের বাবা-মায়ের উচ্চাশা কম ছিল না। তাই বড় ছেলে যখন জুলদিয়ার মেরিন অ্যাকাডেমিতে ভর্তি হলো তাঁরা খুশিই হলেন। মন্দ কি বড় ছেলে সাগর-মহাসাগরে ঘুরে বেড়াবে ধবধবে বিশাল সাদা জাহাজে। ভেসে ভেসে নোঙর ফেলবে নানা জানা-অজানা দেশে।
শিউলির বাবার এই সাগরমুখী নেশাটা পেয়ে বসেছিল ছোটবেলাতেই। সি-ক্ল্যাসিক পড়ে আর সিনেমা দেখে। তিনি স্বপ্ন দেখতেন বিক্ষুব্ধ সাগরজলে ডিঙি চড়ে পাড়ি জমাচ্ছেন অচেনা দ্বীপপুঞ্জে, অজানা লোকালয়ে।
মেরিন ইঞ্জিনিয়ার হয়ে শিউলির বাবা বড় এক বিদেশি কোম্পানির চাকরি ধরে ফেলেন। প্রতিবছর তিনি ছুটিতে দেশে আসতেন। মা-বাবা-ভাইয়ের সঙ্গে সময় কাটিয়ে যেতেন। চতুর্থ বছরের মাথায় তিনি বিয়ে করেন। তার বাবা-মা তা ঠিক করে রেখেছিলেন। অমত করেননি শিউলির বাবা। বিয়ের চতুর্থ বছরে তাঁদের ঘরে আসে শিউলি। বছর-দশেক বিদেশ করে করে শিউলির বাবা দেশের মাটির টানে শুধু নয়, মেয়েটি যে বেড়ে উঠছে, সেই আবদার কি উপেক্ষা করার জো আছে বাবার?
শিউলির বাবা সাগরজলে ভেসে বেড়ানোর চাকরি ছেড়ে মেয়ের কাছে ফিরে আসেন। শিউলি যারপরনাই খুশি। তখন বাবার মনে হতে থাকে … এটাই জীবনের বড় পাওয়া।
দেশি এক শিপিং করপোরেশনে চাকরি নেন শিউলির বাবা। বাড়ি কিনতে গিয়ে জলের ধারে বাড়ি কেনেন। ধানম– লেকের পশ্চিম পাড়ে বাড়ি কিনে স্থায়ী হয়ে বসেন। শিউলিকে ঘিরে
সুখের-শখের স্বর্গ গড়ে তোলার উদ্যোগী হয়ে উঠতে থাকেন।
তিন
শিউলির বাবার চলে যাওয়ার পর প্রতিদিন এলেও চারদিনের মাথায় ছোট চাচা সকাল সকাল আসেন। শিউলির মা তখন তাদের বিছানার জায়নামাজে উপুড় হয়ে পশ্চিমমুখী। ছোট চাচা তখন শিউলির খোঁজ করেন। সে তখন তাদের ফ্ল্যাটের ঝুলবারান্দায়। তার বাবার লাগানো টবে সদ্য ফুটে থাকা একটা টকটকে লাল গোলাপে গাল চেপে ধরে বিড়বিড় করে কথা বলছে, ‘বাবাগো আমারে রেখে তুমি কেমন করে চলে গেলা? কিছু না বলে … তোমার গাছগুলি যে দিব্যি আছে। সকালের সূর্যের আলোয় যে হাসছে … খেলছে … দোল খাচ্ছে।’ শিউলির দু-চোখ বেয়ে তখন জল গড়িয়ে নামে।
চাচা শিউলিকে টেনে কোলে তুলে নেন। তাঁর চোখও অশ্রম্নসিক্ত হয়ে ওঠে। ফুলপাগল, গাছপাগল, জঙ্গলপাগল বড়ভাইয়ের চেহারাটা তাঁর চোখের সামনে ভেসে বেড়াতে থাকে। শিউলিকে স্বাভাবিক করে তোলার জন্যই চাচা ভেজা গলায় বলে যান।
‘মা … বুয়া বলল, তুমি সকাল থেকে কিছু খাওনি। দশটা-এগারোটা বেজে গেল … অসুখ-বিসুখ হয়ে যাবে। তোমাকে তো কলেজে যেতে হবে … বাবার স্বপ্ন …।’
‘চাচু … আমার স্বপ্ন এখন একটাই।’
‘কী?’ চাচা আগ্রহী হন।
‘বাবার এই ঝুলবারান্দায় বসে বসে সময় কাটিয়ে দেওয়া। বাবার হাতে লাগানো ফুলের সঙ্গে। গাছের সঙ্গে। বাকি জীবন …।’
চাচা ধরে নিলেন শিউলিকে এই মর্মান্তিক মানসিক শক থেকে সরিয়ে আনতে হলে তার লাইনেই কথা বলতে হবে। আপাতত এর যে বিকল্প নেই।
‘তোমার বাবার হাতে লাগানো গাছ কয়টা আর তুমি লাগিয়েছ কয়টা?’
কান্নায় ভেঙে পড়ে শিউলি জানায়, ‘আমি আর গাছ লাগালাম কবে? সব তার লাগানো। ওই যে দেখছেন ব্যালকনির কোনায় তার খুন্তি-কাঁচি।’
আঁচলে চোখ মোছে শিউলি।
‘তাঁর বাগান কি শুধু এটুকুই? না, ওই যে লেকের দুপাড়ে যত গাছ … সরকারি-বেসরকারি সংস্থার লাগানো … সে মনে করত সব তার গাছ। এগুলোর ভালোমন্দ দেখার দায়িত্ব সে নিজে থেকে হাতে নিয়ে নিয়েছিল।’
এটুকু বলতে পেরে সে আবার ডুকরে কেঁদে ওঠে।
‘এটাই তো কাল হলো তার। সূর্য ওঠার আগে খুন্তি-কাঁচি হাতে বেরিয়ে যেত। প্রতিটা গাছের সুবিধা-অসুবিধা দেখে … লেক থেকে পানি টেনে তুলে গাছে গাছে তা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে তবে বাড়ি ফিরত … সিঁড়ি ভেঙে, লিফটে চড়ে নয় …।’
আবার সশব্দে কেঁদে ওঠে শিউলি।
প্রসঙ্গ পালটানোর চেষ্টা করে ছোট চাচা।
‘কয়টা টব? সবই কি গোলাপ?’
‘হ্যাঁ ফ্লোরে আছে ১৭টি টব। সব গোলাপ। নানা রঙের। নানা জাতের। এর মধ্যে একটি আবার নতুন আমদানি। পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে আনা। সূর্যমুখী গোলাপ। এতে ফুল হয় মাত্র দুটি। আর ওপরের দুই সারিতে ঝোলানো আছে নানা জাতের অর্কিড।’
‘অর্কিডগুলোর কয়েকটাতে ফুল এসেছে। ফুলগুলো সুন্দর তরতাজা … হালকা রঙের।’
‘অর্কিডের নাম বাবা প্রায়ই আমাকে বলত। আমি যে নাম মনে রাখতে পারিনি। তখন সিরিয়াসলি নিইনি। এখন কে আর বলে দেবে এসবের নাম?’
‘নাহ্, তুমি চিমন্তা করো না। আমি অর্কিড ম্যানুয়াল জোগাড় করে দেবো। তুমি ফুল দেখে … গাছের গঠন-আকার বুঝে চিনে নিতে পারবে। অসুবিধা হবে না।’
শিউলিকে শান্ত দেখায়।
‘মা আমার যে বড় খিদা পেয়েছে। চলো না সামান্য কিছু মুখে দেই।’
শিউলি তারপরও কিছুক্ষণ ঝুলবারান্দায় দাঁড়িয়ে থেকে চাচার সঙ্গে পা বাড়ায়।
পাকের ঘর থেকে বুয়া দৌড়ে আসে।
‘মা-শিউলি, তোমার বাটার টোস্ট টেবিলে ঢাকা। লেমন-টি করে দিচ্ছি।’
সময় নিয়ে সামান্য কিছু মুখে দিয়ে মাকে ডাকতে যায় শিউলি।
বাবার জায়গায় তার আপন ছোট ভাই। একমাত্র ভাই। তার গা ঘেঁষে বসে থাকে শিউলি। দুপুর অবধি যেন কিছুটা বাবার সান্নিধ্য … দূর থেকে ভেসে আসা বাবার গায়ের গন্ধ পায় সে।
দুপুরের আগে থেকে দু-একজন করে আত্মীয়স্বজন আসতে থাকে।
তাঁরা দুপুরের নামাজ সারেন ড্রয়িংরুমে। দুপুরে খেতে বসলে শিউলিকে চাচা তার পাশে বসান। ছোট চাচি শিউলির কাঁদতে থাকা মাকে অনেক কাকুতি-মিনতি, জবরদস্তি করে প্রায় টেনে নিয়ে আসেন খাওয়ার টেবিলে। শিউলি উঠে এসে মায়ের কাছে বসে। শিউলি হয়তো মায়ের জন্যই পেস্নটে সামান্য কিছু ভাত মেখে নিজে মুখে দেয়। মায়ের মুখেও তুলে দেয় দু-এক লোকমা। মা মেয়ের বিষণ্ণ-অবসন্ন চেহারার দিকে চেয়ে কিছু একটা না খেয়েও পারেন না।
আসরের নামাজের পরপর আত্মীয়স্বজন সবাই উঠে পড়ে। তারা বনানী গোরস্তানে যাওয়ার জন্য তৈরি হন।
ছোট চাচা শিউলির কাঁধে সস্নেহ হাত রাখেন।
‘মা কাপড়টা বদলে আয়।’
‘কেন … কোথাও যাচ্ছো তোমরা?’
‘আজ যে চৌঠা … বাবার মৃত্যুর চারদিন … আজ তোমার বাবার মাজার জিয়ারত করতে যেতে হবে। সে তো সাধারণ লোক ছিল না। গাছপাগলা, বৃক্ষপ্রেমিক-ফুলপ্রেমিক এক লোক … লোক তো নয়। বরং বলতে হয় সন্ন্যাসী। সেখানে গেলেও মানুষের সওয়াব হবে। যাও তৈরি হয়ে নাও।’
শিউলি বেঁকে বসে। ‘না চাচা, আমি সেখানে যেতে পারব না। সে আমায় ছেড়ে গেল কেন? আমাকে কিছু না বলে …।’
‘অভিমানী পাগলি … তোর কথাও ঠিক। তবে কি-না অতি আপনজনদেরও যে এ-সময়ে যেতে হয়। না গেলে …।’
‘না চাচু, আমি যাব না।’
অন্যদিকে শিউলির মায়ের অবস্থা আরো নাজুক। আরো নড়বড়ে। ছোট চাচির কাঁধে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়ান। তাদের শোয়ার ঘরের দিকে হেঁটে যান। ছোট চাচি শিউলির মাকে কোনো রকমে গুছিয়ে নিয়ে বের হতে কিছুটা সময় লাগে। প্রায় সবাই নিচে গেলেও শিউলি অনড়। সে যাবে না। ছোট চাচাকে তার একটাই প্রশ্ন, ‘তাদের কাউকে কিছু না বলে চলে গেল কেন বাবা?’ এ পর্যায়ে চাচা দেখলেন, আর কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। অভিমানী মেয়ে যাবে না।
রাস্তা ধরে হাউজের গ্যারেজ পর্যন্ত চারটি গাড়ি তৈরি হয়েছিল। দূরের রাস্তা। ধানম– থেকে বনানী। পথে জ্যামে পড়ার ভয়। ছোট চাচার গাড়িটা এ-গ্যারেজেই রেখেছিলেন। কেননা, শিউলির মায়ের অবস্থাটা যে চলনশীল নয়। ছোট চাচা তার গাড়ি নিজেই ড্রাইভ করেন। তিনি গাড়ির দরজা খুলে লিফটের কাছাকাছি অপেক্ষা করছিলেন। লিফট নিচে এসে খুলে গেলে ছোট চাচি শিউলির মাকে জাপটে ধরে গাড়ির পেছনের সিটে বসে পড়েন। চাচা গাড়ি স্টার্ট দিয়ে কমপেস্নক্সের চত্বর ছেড়ে রাস্তায় নামেন। তখন চাচা দেখেন, সিঁড়ি বেয়ে দৌড়ে শিউলি নামছে আর চিৎকার করছে। হাতে তার ফুল।
‘চাচা দাঁড়ান … আমি আসছি। একটু দাঁড়ান।’
ছোট চাচা খুশি হন।
‘আস মা … আস। এই তো লক্ষ্মী মা …।’
শিউলি এগিয়ে আসে। চাচা গাড়ির সামনের দরজা খুলে ধরেন।
‘না চাচা, আমি যাব না। শুধু এই গোলাপ দুটি তাঁর মাথার কাছে রেখে দিয়ে বলবেন, তুমি তো তোমার শিউলিকে ভালোবাসনি কোনোদিন। ভালোবেসেছো ফুলকে-গাছকে। তুমি জেনে রেখো … আমি প্রাণ দিয়ে হলেও তোমার হাতে লাগানো ফুল আর গাছ বাঁচিয়ে রাখব। তুমি নিশ্চিমেত্ম ঘুমাও।’
তারপরও চাচা মিনতি জানায়।
‘গাড়িতে বস …। একটু দেখে আসি … তোর বাবাকে।’
‘না চাচু, আমি যাব না।’
মা শিউলির বাবাকে হারিয়ে তার কথা বলে খুব বেশি কাঁদতেও পারেননি তেমন। তবে কেঁদেছেন মেয়ের কথা ভেবে। মানুষটা এমন সময়ে চলে গেল যখন মেয়ে-বাবার জীবিত থাকাটা যে বড় দরকার ছিল। শিউলির বয়স বাড়ছে। নানামুখী সামাজিকতার প্রয়োজন হবে। এ-কাজ কি অন্য কাউকে দিয়ে হয়? আশপাশের দু-চারজনও তাই বলে।
চার
শিউলিদের বাড়ির পরিবেশের তেমন কোনো উন্নতি হয়নি। মাসছয়েক কেটে যাওয়ার পরও। শিউলি কলেজে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। তার বন্ধুরা একাধিকবার এসে ফিরে গেছে। কাজ হয়নি। তাদের সঙ্গে দু-চারটা কথা বলে সে বাবার ঝুলবারান্দায় সাজানো গাছগাছালির দিকে চলে গেছে আনমনা হয়ে। একে একে বন্ধু-বান্ধবীরাও আসা-যাওয়া ছেড়ে দেয়। শেষমেশ একজনই টিকে রইল। কাঁকন বালা সেন। সে বিবাহিত হয়েও ধরে রেখেছে লেখাপড়া। সে কলেজ থেকে ফেরার পথে সময়-সময় শিউলির সঙ্গে কিছুক্ষণ কাটিয়ে যায়।
মায়ের অনুরোধে ছোট চাচা শিউলির বিয়ে দেওয়ার কথা ভাবতে থাকেন। মা এছাড়া আর কোনো বিকল্প দেখছেন না। এ-কথাটা নিয়ে তিনি তার স্ত্রীর সঙ্গেও পরামর্শ করেন। দিনতিনেক পরে ছোট চাচি জানান, ‘আজ রবীনদের বাড়ি গিয়েছিলাম।’
‘রবীন জানি কে?’
‘ও মা তোমার দেখি কিছুই মনে থাকে না আজকাল। আমার ফুফাতো ভাই … ব্রিলিয়েন্ট স্টুডেন্ট। বিসিএসে খুব ভালো করেছে। ফরেন সার্ভিসে সিলেকশন পেয়েছে।’
‘তাই … ভেবে দেখি … কিন্তু শিউলিকে যে ম্যানেজ করা এক সমস্যা।’
একটু থেমে আবার চাচি বলেন, ‘সমস্যা একটাই …।’
‘মানে?’
‘মানে তাদের পারিবারিক অবস্থা তেমন না।’
‘কী রকম?’
‘রবীনের বাবা অবসরে গেছেন। মালিবাগে থাকেন। ভাড়া বাড়িতে। ছোট বোনটাও লেখাপড়া তেমন করেনি। কার সঙ্গে জানি ভেগে গিয়েছিল। ফিরে আসেনি।’
ছোট চাচা বিরক্ত হন।
‘দেখো … এসব গ্রাম্য কেচ্ছা আমাকে শোনাবে না। ছেলের বাড়ি নেই তো কী হয়েছে? মেয়ের তো আছে।’
‘তা ঠিক।’ ছোট চাচি থেমে যান।
সেদিন অফিসশেষে ছোট চাচা শিউলিদের বাড়ির দিকে যাচ্ছিলেন। শিউলিদের বাড়ির লিফট থেকে কাঁকন নেমে এলে ছোট চাচার মুখোমুখি পড়ে যায় সে।
সে নমস্কার জানিয়ে চলে যাচ্ছিল। তখন ছোট চাচার মাথায় হঠাৎ করেই একটা বুদ্ধি খেলে যায়। তিনি ভাবেন, মেয়েটা শিউলির ভালো বন্ধু। একাধিকবার তার সঙ্গে আলাপ-পরিচয়ও হয়েছে এ-বাড়িতে। তাকে যদি কোনো কাজে লাগানো যায়?
কাঁকনকে তিনি পেছন থেকে ডাকেন।
‘শোনো … কোন দিকে যাবে তুমি?’
‘রায়েরবাজার।’
‘আমিও তো ওদিকেই যাবো। আমি তোমাকে পৌঁছে দেবো। … তোমার সঙ্গে আমার কিছু আলাপ করতে পারলে ভালো হতো।’
‘কী আলাপ কাকাবাবু।’ কাঁকন ঘুরে দাঁড়ায়।
ছোট চাচা সরাসরি প্রসঙ্গে চলে যান।
‘দেখো, কাঁকন, মেয়েটার কষ্ট আর ভালো লাগে না … সইতে পারছি না। তোমার কি মনে হয় … আমরা ওর জন্য কিছু করতে পারি?’
কাঁকন খানিক সময় নেয়।
‘কাকাবাবু আপনি কি শিউলির কথা বলছেন?’
‘হ্যাঁ।’
‘আমিও কাকাবাবু ওকে নিয়ে চিন্তিত … যেভাবে সে ডিপ্রেশনের দিকে যাচ্ছে … আমার ভয় হয়।’
‘তোমার কি মনে হয় আমরা তার বিয়ের কথা ভাবতে পারি?’
‘আমিও মাঝে মাঝে তাই ভাবি। আমি অলকেশের সঙ্গে এ-ব্যাপারে আলাপও করেছি। স্কুল-কলেজ-বন্ধু-বান্ধব ছেড়ে দিয়ে একেবারে …।’
‘তাই তো। তুমি তো বিয়ে করেছো?’
‘হ্যাঁ কাকাবাবু … একটু কম বয়সেই …।’
‘না কম বয়সে কি আবার, এটাই তো বিয়ের বয়স।’
ছোট চাচা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন।
‘কাঁকন মা তোমার জামাইয়ের সঙ্গে কথা বলো। একটু চেষ্টা করো না … প্লিলজ।’
‘আচ্ছা দেখি কাকাবাবু … অলকেশের সঙ্গে কথা বলব … কিছু করা যায় কি না।’
‘না … না … একটু অপেক্ষা করো। আমি তোমাকে পৌঁছে দেবো।’
‘না কাকাবাবু আজ আসি।’
তিনদিন পর বিকেলবেলা কাঁকন আসে অলকেশকে নিয়ে। ওপরের দৃশ্য একই। শিউলি তাদের ঝুলবারান্দায়। চুপচাপ মোড়ায় বসে। চারপাশে তার বাবার হাতে লাগানো গোলাপের টব। তরতাজা সব। যত্নের ছাপ।
কাঁকনের প্রথম ডাকে সে উত্তর দেয়নি। অগত্যা তাকে পস্নল্যানমাফিক বলতেই হয়, ‘শিউলি, অলকেশ এসেছে।’
শিউলি এবার উঠে দাঁড়ায়।
‘মানে!’ আশ্চর্য হয় সে।
‘মানে আমার জামাই এসেছে। তার সঙ্গে তো তোর দেখা হয়েছে। তাই না?’
শিউলি বিড়বিড় করে।
‘হবে হয়তো …’
শিউলি তার কিছুদিনের স্বভাবসুলভ ঘোর কাটিয়ে বারান্দা থেকে বের হয়।
কাঁকন ভাবে, এমনটাই চাইছিলাম।
শিউলি এসে তাদের মুখোমুখি বসে।
শিউলি বুয়াকে ডাকে।
‘মাকে ডেকে আনো। মেহমান এসেছে। চা বসাও।’
কিছুক্ষণ এ-কথা সে-কথা … হালকা গল্প-গুজবের পর কাঁকনই কথাটা পাড়ে।
‘আমরা বেরিয়ে ছিলাম বাইরে কোথাও খাব বলে। আমাদের দ্বিতীয় বিবাহ-বাসর আজ।’ কাঁকন সলজ্জ হাসে।
শিউলি ফ্যালফ্যাল করে তাদের দিকে চেয়ে থাকে। যেন তাদের কথা বুঝতে পারেনি সে।
‘আপনিও চলুন … শুধু দুজনে কেমন দেখায়।’ অলকেশ তাকে আমন্ত্রণ জানায়।
‘চল শিউলি, অলকেশ এমন করে বলছে … আমারও ভালো লাগবে।’
ততক্ষণে মা মাগরিবের নামাজ সেরে এ-ঘরে আসেন। তাদের কথোপকথন শোনেন খানিক। মা সজাগ হন।
‘যা না … ঘুরে এলে ভালো লাগবে। সারাদিন বাড়িতে। একা একা …।’
মায়ের মুখে ‘একা একা’ কথাটা যেন শিউলিকে খানিকটা ভাবালু করে। বিচলিত করে।
তার তখন মনে পড়ে যায় বাবাকে। সেই মানুষটিই তো তার চারপাশ, সব কুল ভরিয়ে রেখেছিল। কী থেকে কী যে হয়ে গেল? নিজেই নিজের কাছে সে এক সমস্যা হয়ে উঠেছে। মায়ের জন্যও তার কষ্ট হয়। দুঃখ বাড়তে থাকে। অথচ তার চারপাশের সবই যে ঠিকঠাক আছে। দিব্যি আছে কাঁকন-অলকেশ, তার অন্য সব বন্ধু। শুধু সে-ই …।
ব্যাপারটা কাঁকন যেন আন্দাজ করতে পারে। এটাই ভালো সময়। ‘মানুষের সঙ্গে দু-চারটা কথা বললেও তো ভালো লাগে। মন হালকা হয়। সময় ভালো কাটে। চলো আমাদের সঙ্গে।’
শিউলির কাছে যে কথাগুলো নতুন তা নয়। তবে তার সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় কাঁকন অলকেশকে একসঙ্গে দেখে তার খানিক মানসিক পরিবর্তন হয়। সে ভাবে, তারা তো বেশ আছে। হেসেখেলে, ঘরসংসার করে দিন কাটে তাদের। তার দিন যে কেমন কাটে তা সে অনুভব করে। তার চারপাশ যেন দুর্ভেদ্য এক পর্দায় ঢাকা।
মা তাদের চা এগিয়ে দিতে গিয়ে আবার তাড়া দেওয়ার চেষ্টা করেন।
‘যা-না মা … তারা দূর থেকে পস্নল্যান করে এসেছে। একসঙ্গে খাবে। কত ভালো বন্ধু তোর। তাদের অনুরোধ …।’
হঠাৎ করে শিউলি নিয়ন্ত্রণহারা হয়েই যেন মুখ খোলে, ‘তোরা কোথায় খেতে যাবি?’
‘কেন তোদের বাড়ির কাছেই তো রেসেন্তারাঁ … অনেক হোটেল। দেশি-চাইনিজ-কাবাব হাউস। তোদের বাড়ির পরের রাস্তায় তো সব। সাতাশ নম্বর রোডে।’
‘কাবাব-টাবাব বাবা আমার ভালো লাগে না।’
‘তাহলে চাইনিজ … জিনডিয়ান রেসেন্তারাঁই ভালো এ-এলাকায়।’
‘কাপড় বদলাতে হবে আবার।’
‘নাহ … তোকে তো এমনি সুন্দর লাগছে।’ কাঁকন উঠে দাঁড়ায়।
মায়ের মুখে হাসি ফোটে। ইশারা-ইঙ্গিতে কাঁকনকে তিনি উৎসাহ দেন।
‘যাও মা তোমরা। যাও, আলস্নলাহ ভরসা।’
পাঁচ
ধানম– ১৫ ছেড়ে গলিমুখের মাথায় সদা ব্যস্ত, সদা জ্যাম লাগা ২৭ নম্বর সড়ক। এ-রাস্তার সামান্য পশ্চিমমুখী হেঁটে গেলেই জিনডিয়ান চাইনিজ রেসেন্তারাঁ। কাঁকন এগিয়ে যায়। শিউলি অলকেশ তার পেছন পেছন। তারা রেসেন্তারাঁর দোতলায় উঠে গেলে শিউলি টানা কাচের পাশের খোলামেলায় বসে। চারপাশ আলোকিত। সড়কের চলন্ত গাড়ি-ঘোড়া-রিকশা মানুষের ব্যস্ততা। শিউলি কাঁকনের দিকে চেয়ে হাসে।
‘কতদিন হবে মনেও পড়ছে না ছাই, বাড়ি ছেড়ে বের হইনি।’
কাঁকন-অলকেশও হাসে। প্রশান্ত হয়ে। তারা তাদের পস্নল্যানমাফিক আপাতত সফল। শিউলির ছোট চাচা তো এতটুকু সাহায্যই চেয়েছিলেন তার কাছে।
তারা খাবার অর্ডার করার প্রস্ত্ততি নেয়। মেন্যু বুক হাতে তুলে নেয়। হঠাৎ করে শিউলি বেশি তৎপর হয়ে ওঠে।
‘আমি কিন্তু চিকেন কর্ন সুপ খাব। থাই সুপও ভালো। তবে একটু ঝাল।’
কাঁকন আরো খুশি হয়। ‘তাই হবে। আর …?’
‘স্মোকড সিস্নপার ফিশ …।’ তখন শিউলির মনে পড়ে, সে যে সঙ্গে টাকা নিয়ে আসেনি। সে থেমে গিয়ে খানিক লজ্জিত হয়।
‘কাঁকন মস্ত একটা ভুল হয়ে গেছে।’
‘কী?’
‘খালি পকেটে দৌড়ে চলে এসেছি।’
অলকেশ আমুদে হয়ে ওঠে।
‘তুমি আজ আমাদের গেস্ট। আমরা না তোমাকে নিয়ে এলাম। বরং তুমি আমাদের একদিন খাইয়ে দিও … কেমন?’
‘অবশ্যই।’
তারা সুপসহ আরো কিছু অর্ডার করে। সুপ এসে যায়। শিউলি বাটিতে সুপ তুলে নিতে তৎপর হয়। আর তখনই তার ছোট চাচা-চাচি ও আর একজন অপরিচিত ছেলে তাদের টেবিলের পাশে এসে দাঁড়িয়ে যায়। হাসতে হাসতে চাচি বলেন,
‘কী আশ্চর্য … কী সৌভাগ্য আমাদের। এমনভাবে দেখা হয়ে যাবে তো ভাবিনি।’
শিউলি উঠে দাঁড়াতে চায়। চাচা বাধা দেন।
‘দাঁড়াতে হবে না। আমরাও তোমাদের পাশের টেবিল দখল করে বসছি। ক্ষুধায় আমার পেট চোঁ-চোঁ করছে।’
পাশের টেবিলে বসতে বসতে শিউলির আড়াল থেকে ছোট চাচা হাসিমুখে কাঁকনকে মুষ্টিবদ্ধ বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখান।
তারাও মেন্যু দেখে খাবারের অর্ডার করে। এ-ব্যাপারে তাদের সঙ্গে তৃতীয় যুবক ছেলেটিই বেশি তৎপর হয়ে রইল।
শিউলি-কাঁকনের দল খাবারের পর্ব শেষ করে উঠে দাঁড়ায়। পাশের টেবিলের দিকে এগিয়ে যায়। ‘কাকা আমরা আসি। রাত বাড়ছে।’
‘তা যাও … তোমরা তো যাবে রায়েরবাজারের দিকে। শিউলি? তার পথ-তো উলটো। তোমরা বরং যাও। শিউলিকে আমি পৌঁছে দেবো।’
শিউলি হালকা আপত্তি করতে গেলে চাচা তাকে টেনে তার পাশে বসান।
কাঁকন-অলকেশ সফলতার হাসি ছড়িয়ে চলে যায়।
শিউলির চাচার পাশে গা-লাগা চেয়ারে বসেছে অপরিচিত যুবক ছেলেটি।
ছোট চাচা ছেলেটির সঙ্গে শিউলিকে পরিচয় করিয়ে দেন।
‘ও রবীন … তোমার এক ভাই। চাচির ফুফাতো ভাই …। সে বিসিএস দিয়ে ফরেন সার্ভিস পেয়েছে। চলে যাবে বিদেশ।’
রবীন মুখে চিকেন রোস্ট তুলে নিয়ে মিষ্টি হাসে।
‘আপনিই শিউলি … আপনার কথা অনেক শুনেছি। দেখা হয় নাই।’
চাচি তৎপর হয়ে ওঠেন।
‘দেখা হয় নাই। এখন হবে … দেখা-সাক্ষাৎ যখন একবার হয়েছে।’
শিউলি খানিক লজ্জা-নম্র হয়। মাথা নুইয়ে নেয়।
কিছুটা সময় পরে সবাই ওঠে।
শিউলিদের গেটের সামনে গাড়ি থামে। ছোট চাচা গেট খুলে ধরলে শিউলি নামে। নামেন চাচিও।
‘কই রবীন নামো … এসেই যখন পড়েছি, বড় ভাবিকে একবার সালাম না দিয়ে যাই কেমনে?’
চাচা তাতে সমর্থন দেন।
সবাই লিফটের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। শিউলি ঘোরানো সিঁড়ি ধরতে পিছিয়ে যায়।
‘আপনারা ওঠেন। আমি আসছি।’
লিফটে চড়ে চাচা সবাইকে শুনিয়ে বিড়বিড় করেন।
‘বেচারীর বাবাও লিফটে চড়তেন না! সিঁড়ি ধরে উঠতেন আর সেই সিঁড়িতেই তার কাল হলো।’
রবীন কৌতূহলী হয়ে শোনে।
চারতলায় উঠে সবাই শিউলির মায়ের ঘরের দিকে হাঁটে। মা দেরিতে এশার নামাজ পড়ে উঠে দাঁড়ান। কিছুটা আশ্চর্য হন।
‘কী গো, তোমরা সবাই একসঙ্গে কোত্থেকে?’